শিক্ষাব্যবস্থার টেকসই উন্নয়নে প্রয়োজন স্বাধীন স্থায়ী কমিশন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শেষ হয়েছে। তবে একটি জাতির প্রকৃত অগ্রযাত্রা নির্ভর করে তার শ্রেণিকক্ষের ওপর, যেখানে ভবিষ্যৎ নাগরিকদের চিন্তা, দক্ষতা ও মূল্যবোধ গড়ে ওঠে। সেই বাস্তবতায় বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখন এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।
গত কয়েক বছরে ঘন ঘন নীতিগত পরিবর্তন, কারিকুলামে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং মানগত অস্থিরতা শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে বিভ্রান্তি বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষার সনদ থাকা সত্ত্বেও কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়াচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী প্রাথমিক ভাষাগত ও গাণিতিক সক্ষমতাও সন্তোষজনকভাবে অর্জন করতে পারছে না।
শিক্ষায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় পিছিয়ে। ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী, একটি দেশের জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ অথবা জাতীয় বাজেটের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন। সেখানে বাংলাদেশে বরাদ্দ দীর্ঘদিন ধরে জিডিপির প্রায় ১ দশমিক ৭৬ থেকে ২ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় এ হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম। তবে কেবল বরাদ্দ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, বরং অর্থের কার্যকর ও লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে শিক্ষা খাতে ব্যয়ের বড় অংশ অবকাঠামো নির্মাণ ও বেতনভাতায় ব্যবহৃত হয়। অথচ গবেষণা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, আধুনিক ল্যাবরেটরি, ডিজিটাল কনটেন্ট এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার উন্নয়নে বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে কম। ফলে কাঠামো তৈরি হলেও গুণগত মানের উন্নয়ন প্রত্যাশিত গতিতে এগোয় না।
এই প্রেক্ষাপটে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে। বিচ্ছিন্ন সংস্কারের বদলে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নির্ধারণ, নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিতকরণ এবং শিক্ষাকে বৈশ্বিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে একটি স্থায়ী কমিশন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
একটি কার্যকর কমিশনে কেবল প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা নয়, বহুমাত্রিক জ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয় জরুরি। এতে থাকতে পারেন শিক্ষাবিদ, গবেষক, অভিজ্ঞ শিক্ষক, শিশু মনোবিজ্ঞানী এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, যাতে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কোডিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডাটা সায়েন্সের মতো বিষয়গুলো প্রাথমিক স্তর থেকেই সমন্বিত করা যায়। একই সঙ্গে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার বিস্তারে সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রয়োজন।
অতীত অভিজ্ঞতা বলে, কমিশন গঠন করলেই সাফল্য নিশ্চিত হয় না। সুপারিশ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং স্বচ্ছতা অপরিহার্য। অনেক সময় মূল্যবান প্রতিবেদন নীতিনির্ধারণের টেবিল ছাড়িয়ে বাস্তবে পৌঁছায় না। তাই কমিশনকে হতে হবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এবং জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক।
বিভিন্ন শিক্ষাবিষয়ক সংগঠন ও সুধীজন দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার মানোন্নয়ন, নৈতিক শিক্ষার সমন্বয় এবং নীতিগত সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছেন। নির্বাচন-পূর্ব সময়ে শিক্ষা বিষয়ক আলোচনাও জনপরিসরে গুরুত্ব পেয়েছে। এখন সময় সেই আলোচনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার।
একটি মেধাভিত্তিক, বৈষম্যহীন ও দক্ষ মানবসম্পদসমৃদ্ধ সমাজ গঠনের জন্য শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক ও টেকসই করতে হবে। নবগঠিত সরকার যদি দ্রুত একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন শিক্ষা কমিশন গঠন করে, তবে তা কেবল নীতিগত পরিবর্তনই নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়িত্ব পালনের প্রতিফলন হবে। সময়ের এই সন্ধিক্ষণে সিদ্ধান্তহীনতা নয়, দূরদর্শী পদক্ষেপই হতে পারে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার প্রকৃত ভিত্তি।