ক্ষমতায়নের পাশাপাশি প্রয়োজন নারীর সাহসায়ন:সারওয়ার ই আলম
মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় শক্তি তার আত্মবিশ্বাস। নারী হোক কিংবা পুরুষ, আত্মবিশ্বাসই তাকে জীবনের নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার শক্তি দেয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো আমাদের সমাজে ছোটবেলা থেকেই অনেক ক্ষেত্রে নারীর আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠার সুযোগ সংকুচিত হয়ে যায়। নানা সামাজিক বিধিনিষেধ, অনুশাসন ও প্রচলিত ধারণার কারণে অনেক মেয়েই নিজের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি বিকশিত করার সুযোগ পায় না।
সোমবার ৯ মার্চ লন্ডন থেকে পাঠানো এক মতামতে লেখক উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে অধিকাংশ পরিবারে ছেলে ও মেয়ের বেড়ে ওঠার পরিবেশ এক নয়। একটি ছেলে যে স্বাধীনতা নিয়ে বড় হয়, একটি মেয়ে প্রায়শই সেই স্বাধীনতা পায় না। ফলে ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের জগৎ অনেক সময় সীমিত হয়ে পড়ে। বাইরের পৃথিবীর নানা বাস্তবতা, চ্যালেঞ্জ ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তাদের তুলনামূলকভাবে কম থাকে।
পরিবারের ভেতরেই এই পার্থক্যের শুরু হয়। একটি ছেলে কৈশোরে পা দেওয়ার পর সহজেই বাইরে চলাফেরা, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা বিভিন্ন সামাজিক পরিসরে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। অন্যদিকে একই বয়সের একটি মেয়েকে প্রায়শই আরও বেশি গৃহকেন্দ্রিক হয়ে থাকার জন্য উৎসাহিত করা হয়। পোশাক, চলাফেরা কিংবা সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও নানা বিধিনিষেধ তার সামনে তৈরি হয়।
এই বৈষম্যমূলক বাস্তবতার ফলে অনেক মেয়েই বাইরের পৃথিবীর নানা অভিজ্ঞতা থেকে দূরে থেকে বড় হয়। জীবনের পরবর্তী সময়ে যখন তাকে সমাজের নানা পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তখন সেই অভিজ্ঞতার ঘাটতি তার আত্মবিশ্বাসকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে সমাজে নারীর ওপর নির্ভরশীলতার প্রবণতাও তৈরি হয়।
আমাদের সমাজে শিক্ষা ও প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও এই পার্থক্য অনেক সময় দেখা যায়। পরিবারের ছেলে সন্তানের শিক্ষা ও পেশাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করা হয় অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে। তাকে দক্ষ ও প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। অন্যদিকে অনেক পরিবারে মেয়ের ক্ষেত্রেও সমানভাবে শিক্ষা ও আত্মনির্ভরতার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন হলেও সেই দৃষ্টিভঙ্গি সব জায়গায় সমানভাবে গড়ে ওঠেনি।
সমাজে নারীর নিরাপত্তা নিয়েও প্রায়ই আলোচনা হয়। অনেকেই বলেন সমাজ সবসময় নারীদের জন্য সমানভাবে নিরাপদ নয়। বাস্তবতার এই দিকটি অস্বীকার করা যায় না। তবে একই সঙ্গে প্রয়োজন এই বাস্তবতাকে পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া। একটি সত্যিকারের সমঅধিকারভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে হলে নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য সমান সুযোগ, নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করা জরুরি।
এই পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে পরিবার থেকেই। পরিবার যদি ছেলেমেয়েকে সমান সুযোগ দিয়ে বড় করে তোলে, তাদের সমানভাবে আত্মবিশ্বাসী হতে শেখায়, তাহলে ভবিষ্যতের সমাজও আরও সমতাভিত্তিক হয়ে উঠবে। একটি মেয়ে যদি ছোটবেলা থেকেই বাইরের পৃথিবী সম্পর্কে জানার, শেখার এবং নিজেকে প্রস্তুত করার সুযোগ পায়, তবে সে জীবনের প্রতিটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নানা উদ্যোগ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হচ্ছে। তবে সেই উদ্যোগের পাশাপাশি প্রয়োজন নারীর সাহস ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার পরিবেশ তৈরি করা। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে এই সচেতনতা তৈরি করা জরুরি।
কারণ আত্মবিশ্বাসী ও সাহসী একজন নারী শুধু নিজের জীবনই বদলে দিতে পারেন না, তিনি একটি পরিবারকে আলোকিত করেন, একটি সমাজকে শক্তিশালী করেন এবং একটি জাতির অগ্রযাত্রাকে নতুন শক্তি দেন।