মধ্যপ্রাচ্যের বড় শ্রমবাজার সংকুচিত, নতুন গন্তব্যে বাড়ছে প্রতারণা
বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের বড় কয়েকটি প্রচলিত বাজার সংকুচিত হওয়ায় বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা কমছে। একই সঙ্গে নতুন শ্রমবাজারের আশায় রাশিয়া ও কম্বোডিয়ার মতো দেশে গিয়ে প্রতারণা, মানব পাচার এমনকি জীবনহানির ঝুঁকিতেও পড়ছেন অনেক বাংলাদেশি।
শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিদেশে যাওয়ার ছাড়পত্র পেয়েছেন প্রায় ৫ লাখ কর্মী। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ৭ লাখ ৪০ হাজার। অর্থাৎ এক বছরে ছাড়পত্র কমেছে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার।
বাংলাদেশের কর্মীদের বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরব, ওমান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কুয়েত ও বাহরাইনের মতো বাজারের ওপর নির্ভরশীল। ২০১১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে ২০৩টি দেশে ১ কোটি ১০ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী গেলেও তাঁদের প্রায় ৯৪ শতাংশ গেছেন মাত্র ১০টি দেশে।
এর মধ্যে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ২০২৪ সালের জুন থেকে বন্ধ। ওমানের বাজারও ২০২৪ সাল থেকে কার্যত বন্ধ রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২০২৩ সালে প্রায় এক লাখ বাংলাদেশি কর্মী গেলেও ২০২৫ সালে তা নেমে আসে ১৩ হাজার ৭৫০ জনে। বাহরাইনেও দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রবেশ সীমিত।
বর্তমানে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি যাচ্ছেন সৌদি আরবে। ২০২৪ সালে দেশটিতে সোয়া ছয় লাখের বেশি এবং ২০২৫ সালে ৭ লাখ ৫৫ হাজারের বেশি কর্মী যান। তবে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এই সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজারে নেমে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সেখানে যাওয়া অনেক কর্মী চুক্তি অনুযায়ী কাজ পাচ্ছেন না।
পুরোনো বাজারের সংকটের মধ্যে নতুন গন্তব্য হিসেবে কম্বোডিয়া ও রাশিয়ায় কর্মী যাওয়া বেড়েছে। ২০২৫ সালে কম্বোডিয়ায় যাওয়ার ছাড়পত্র পান ১২ হাজার ২৬৩ বাংলাদেশি এবং রাশিয়ায় যান ৪ হাজার ৭২৭ জন। তবে এসব গন্তব্যে গিয়ে প্রতারণার শিকার হওয়ার অভিযোগও বাড়ছে।
কম্বোডিয়ায় কলসেন্টারে চাকরির কথা বলে অনেক বাংলাদেশিকে নিয়ে গিয়ে অনলাইন প্রতারণার কাজে যুক্ত করার অভিযোগ রয়েছে। দেশটির বিভিন্ন ‘স্ক্যাম সেন্টারে’ অভিযান চালানোর পর গত জুনে ৬৪৬ বাংলাদেশি দেশে ফিরে আসেন। আরও অনেকে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন।
রাশিয়ায় চাকরির নামে নেওয়ার পর কিছু বাংলাদেশির ইউক্রেন যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। ব্যাংককভিত্তিক ফোর্টিফাই রাইটস ও ইউক্রেনভিত্তিক ট্রুথ হাউন্ডসের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে অংশ নেওয়া শতাধিক বাংলাদেশির মধ্যে গত মার্চ পর্যন্ত ৩৪ জন নিহত হয়েছেন।
এদিকে ইউরোপে উন্নত জীবনের আশায় অবৈধ পথে যাওয়ার প্রবণতাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে পৌঁছানো মানুষের মধ্যে বাংলাদেশিদের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৬৯১, যা মোট আগমনকারীর প্রায় ৩২ শতাংশ। লিবিয়াসহ বিভিন্ন পথে যেতে গিয়ে অনেকেই প্রতারণা, নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায়ের শিকার হচ্ছেন।
মানব পাচারের মামলায় শাস্তির হারও অত্যন্ত কম। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে হওয়া ৪ হাজার ৪২৭ মামলার ৯৪ থেকে ৯৫ শতাংশ আসামি খালাস পেয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পাচারকারীদের কার্যকর বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ায় এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক জানিয়েছেন, বন্ধ ও সংকুচিত শ্রমবাজারে আবার কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন বাজার তৈরিতে সরকার কাজ করছে। সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশের বাইরে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যেও কার্যক্রম চলছে।
অভিবাসন খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন দেশ খোঁজা নয়—বিদেশি নিয়োগপত্র যাচাই, রিক্রুটিং এজেন্সির কার্যক্রমে কঠোর নজরদারি এবং নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসন নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে নতুন শ্রমবাজারের আশায় বিদেশে যাওয়া কর্মীদের প্রতারণা ও মানব পাচারের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।