আল্লাহর নামে মিথ্যা শপথ, কঠোর সতর্কবার্তা ও ভয়াবহ পরিণতির বর্ণনা
ইসলামে আল্লাহর নামে মিথ্যা শপথ করা গুরুতর কবিরা গুনাহ হিসেবে বিবেচিত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট সতর্ক করে দিয়েছেন, যারা পার্থিব স্বার্থের বিনিময়ে আল্লাহর নামে করা অঙ্গীকার ও শপথ ভঙ্গ করে, আখিরাতে তাদের কোনো কল্যাণকর অংশ থাকবে না। কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না, রহমতের দৃষ্টি দেবেন না এবং তাদের পরিশুদ্ধও করবেন না। তাদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে কঠিন শাস্তি। সুরা আলে ইমরান আয়াত ৭৭ এ এ সতর্কবার্তা উল্লেখ রয়েছে।
তাফসিরে বর্ণিত হয়েছে, এক খণ্ড জমি নিয়ে দুই ব্যক্তির বিরোধের ঘটনায় বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তারা বিচারপ্রার্থনা নিয়ে মহানবী মুহাম্মদ সা এর দরবারে হাজির হন। বিবাদী পক্ষ নিজের দাবির পক্ষে শপথ করতে উদ্যত হলে উল্লিখিত আয়াত নাজিল হয়। ফলে তাকে শপথ থেকে বিরত রাখা হয় এবং প্রকৃত মালিকের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এ ঘটনা দেখায়, মিথ্যা শপথের মাধ্যমে অন্যের সম্পদ বা অধিকার হরণ আল্লাহর কাছে কতটা নিন্দিত।
সহিহ হাদিসে এ বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি এসেছে। সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা থেকে বর্ণিত, নবী সা বলেছেন, যে ব্যক্তি অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রহণ করতে মিথ্যা শপথ করে, সে কেয়ামতের দিন আল্লাহর অসন্তুষ্টি নিয়ে উপস্থিত হবে। আরেক বর্ণনায় উল্লেখ আছে, কেউ জেনেশুনে নিজের নয় এমন সম্পদ দখলের জন্য শপথ করলে আল্লাহর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হবে ক্রুদ্ধ অবস্থায়।
সাহাবি আবু উমামা রা থেকে বর্ণিত আরেক হাদিসে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি শপথের মাধ্যমে কোনো মুসলমানকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, আল্লাহ তার জন্য জাহান্নাম অবধারিত করে দেন এবং জান্নাত হারাম করে দেন। বিষয়টি যদি সামান্যও হয়, যেমন একটি গাছের ডাল, তবুও অপরাধের গুরুত্ব কমে না। এতে বোঝা যায়, অধিকারের প্রশ্নে ছোট বড় বিবেচনা নয়, বরং ন্যায়ের প্রশ্নটাই মুখ্য।
আরও এক হাদিসে এসেছে, কেয়ামতের দিন তিন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে আল্লাহ কথা বলবেন না, তাদের পরিশুদ্ধ করবেন না এবং তাদের জন্য থাকবে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। এদের মধ্যে রয়েছে অহংকারবশত পোশাক পায়ের গিরার নিচে ঝুলিয়ে পরিধানকারী, দান করে খোটা দেওয়া ব্যক্তি এবং পণ্য বিক্রির সময় মিথ্যা শপথকারী। ব্যবসায়িক স্বার্থে আল্লাহর নামে অসত্য বলা তাই অত্যন্ত জঘন্য কাজ হিসেবে বিবেচিত।
শরিয়তের পরিভাষায় এ ধরনের ইচ্ছাকৃত মিথ্যা শপথকে বলা হয় ইয়ামিনে গামুস, অর্থাৎ এমন শপথ যা মানুষকে পাপে নিমজ্জিত করে এবং পরিণামে জাহান্নামের দিকে ঠেলে দেয়। কারণ এতে একই সঙ্গে আল্লাহর নামে মিথ্যা বলা, অন্যের অধিকার হরণ এবং সমাজে অবিচার ও অবিশ্বাস ছড়িয়ে দেওয়ার মতো একাধিক অপরাধ সংঘটিত হয়।
বিশেষজ্ঞ আলেমরা উল্লেখ করেছেন, বান্দার হক নষ্ট হলে শুধু তওবা যথেষ্ট নয়, ক্ষতিগ্রস্তের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া আবশ্যক। অন্যথায় আখিরাতে কঠিন জবাবদিহির সম্মুখীন হতে হবে।
ইসলাম সত্যবাদিতাকে মুমিনের অন্যতম প্রধান গুণ হিসেবে ঘোষণা করেছে। সামান্য লাভ, সম্পদ বা ব্যবসায়িক সুবিধার আশায় আল্লাহর নামে মিথ্যা বলা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষতির কারণ। তাই শপথকে তুচ্ছ না ভেবে, সত্যের ওপর অটল থাকা এবং অন্যের অধিকার রক্ষায় সচেতন হওয়াই একজন বিশ্বাসীর প্রকৃত পরিচয়। সত্যের পথ হয়তো কঠিন, কিন্তু সেটিই মুক্তির পথ, সেটিই নিরাপদ পরিণতির আশ্বাস।