১৬তম তারাবিতে কোরআনের আলোচনায় রহমানের বান্দাদের গুণাবলি
পবিত্র রমজানের ধারাবাহিকতায় ১৬তম তারাবিতে মুসল্লিরা পবিত্র কোরআনের ১৯তম পারা তেলাওয়াত করবেন। এ রাতে সূরা ফুরকানের শেষাংশ, পূর্ণ সূরা শুআরা এবং সূরা নামলের প্রথম অংশ পাঠ করা হবে। এসব আয়াতে আল্লাহর একত্ববাদ, পূর্ববর্তী নবীদের ইতিহাস এবং নেককার মানুষের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) অনুষ্ঠিত ১৬তম তারাবির তেলাওয়াতে সূরা ফুরকানের ২১ থেকে ৭৭ নম্বর আয়াত পড়া হবে। এ অংশে মুশরিকদের নানা প্রশ্ন ও আপত্তির জবাব দেওয়া হয়েছে। তারা দাবি করত কেন ফেরেশতা নাজিল করা হয় না কিংবা কেন তারা নিজেদের চোখে রবকে দেখতে পায় না। কোরআনে জানানো হয়েছে, মৃত্যুর সময় ফেরেশতাদের দেখা যাবে এবং সেদিন অনুতাপ ছাড়া তাদের আর কিছু করার থাকবে না।
কিয়ামতের দিনের কঠিন পরিণতির কথাও এই আয়াতে তুলে ধরা হয়েছে। তখন জালিমরা আফসোস করে বলবে, যদি তারা নবীর পথ অনুসরণ করত। সেদিন মহানবী আল্লাহর কাছে অভিযোগ করবেন যে তার উম্মতের একাংশ কোরআনের শিক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।
এই অংশে কয়েকজন নবী ও তাদের জাতির উদাহরণ তুলে ধরে নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সান্ত্বনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আল্লাহর অসীম ক্ষমতা ও একত্ববাদের প্রমাণও বর্ণনা করা হয়েছে।
সূরা ফুরকানের শেষ অংশে রহমানের বিশেষ বান্দাদের গুণাবলি তুলে ধরা হয়েছে। এসব গুণের মধ্যে রয়েছে বিনয় ও নম্রতা, অজ্ঞ মানুষের সঙ্গে সহনশীল আচরণ, রাত জেগে ইবাদত করা, আল্লাহর আজাবের ভয় রাখা এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা। তারা শিরক, অন্যায় হত্যা, মিথ্যা সাক্ষ্য ও অবৈধ সম্পর্ক থেকে দূরে থাকে এবং মন্দ কাজের আসর থেকে নিজেদের বিরত রাখে। এ গুণাবলির অধিকারীদের জন্য জান্নাতে বিশেষ পুরস্কারের ঘোষণা দিয়ে সূরাটি সমাপ্ত হয়েছে।
১৬তম তারাবিতে তেলাওয়াত করা হবে সূরা শুআরাও। এই সূরার শুরুতে পবিত্র কোরআনের মর্যাদা ও নবী মুহাম্মদের প্রতি উম্মতের জন্য তার গভীর মমত্ববোধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বলা হয়েছে, যারা কোরআনের নির্দেশনা অনুসরণ করে না তাদের পরিণতি পূর্ববর্তী অবাধ্য জাতিগুলোর মতোই হবে।
এ সূরায় হজরত মুসা, ইবরাহিম, নূহ, হুদ, সালেহ, লুত ও শুআইব আলাইহিমুস সালামের দাওয়াত ও তাদের জাতির পরিণতির বর্ণনা রয়েছে। আল্লাহ প্রদত্ত অসংখ্য নেয়ামত পাওয়ার পরও তারা অবাধ্যতা অবলম্বন করায় ধ্বংসের মুখে পড়ে। এসব ঘটনার মাধ্যমে মানুষের জন্য শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যে সত্যের অনুসারীরাই শেষ পর্যন্ত সফল হয় এবং জুলুম ও অহংকারের পথ ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।
তারাবির এ পারায় সূরা নামলের প্রথম অংশও পড়া হবে। সূরাটির শুরুতে কোরআনের মর্যাদা ও হেদায়েতের আলোচনার মাধ্যমে বিষয়বস্তু শুরু হয়েছে। পরে হজরত মুসা, সালেহ ও লুত আলাইহিমুস সালামের সংক্ষিপ্ত ঘটনাও বর্ণিত হয়েছে।
এই সূরায় হজরত দাউদ ও তার পুত্র সুলাইমান আলাইহিমুস সালামের ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা সুলাইমান আলাইহিস সালামকে মানুষ, জিন ও বিভিন্ন প্রাণীর ওপর বিশেষ ক্ষমতা দিয়েছিলেন এবং তিনি পাখিদের ভাষাও বুঝতেন।
একটি ঘটনায় বর্ণিত হয়েছে, সুলাইমান আলাইহিস সালাম তার বাহিনীসহ একটি পিঁপড়ার বাসার পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় একটি পিঁপড়া অন্যদের সতর্ক করে দেয় যেন তারা গর্তে ঢুকে পড়ে, যাতে সৈন্যরা অজান্তে তাদের পিষে না ফেলে। এ কথা শুনে সুলাইমান আলাইহিস সালাম আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
সূরায় হুদহুদ পাখির মাধ্যমে সাবা রাজ্যের রানির খবর পাওয়ার ঘটনাও বর্ণিত হয়েছে। পরে সুলাইমান আলাইহিস সালামের আহ্বানে সেই রানী তার দরবারে উপস্থিত হয়ে সত্য উপলব্ধি করেন এবং আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ করেন।
এভাবে ১৯তম পারার আলোচনায় মানুষের জন্য বহু শিক্ষণীয় দিক তুলে ধরা হয়েছে। বিনয়, ন্যায়, ধৈর্য ও আল্লাহভীতির মতো গুণাবলি মানুষকে সফলতার পথে নিয়ে যায় আর অহংকার, অবাধ্যতা ও অন্যায়ের পথ শেষ পর্যন্ত ধ্বংসের দিকেই ধাবিত করে।
রমজানের তারাবির প্রতিটি রাতই যেন মানুষকে আত্মশুদ্ধি ও সত্যের পথে ফিরে আসার নতুন আহ্বান জানায়। কোরআনের বাণী হৃদয়ে ধারণ করতে পারলে মানুষের জীবন আলোকিত হয় এবং সেই আলোই সমাজকে ন্যায়, শান্তি ও মানবিকতার পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।