সেনাবাহিনীর ৩০ বছরের চাকরিতে শিখিয়েছে ভারত আমাদের প্রধান শত্রু, ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দিতে আযমীর বক্তব্য
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১ এ জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে জেআইসি বা আয়নাঘরে গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে দ্বিতীয় দিনের জবানবন্দিতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহিল আমান আযমী বলেছেন, সেনাবাহিনীর দীর্ঘ চাকরিজীবনে তাকে শেখানো হয়েছিল ভারত বাংলাদেশের প্রধান শত্রু। তিনি বলেন, ভারতের বিরুদ্ধে লেখালেখি যদি অপরাধ হয়, তাহলে সেই একই অপরাধে বহু সেনা কর্মকর্তা সমানভাবে দায়ী।
০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে আযমী বলেন, তাকে ২০১৬ সালের ২২ আগস্ট রাজধানীর মগবাজারের বাসা থেকে তুলে নেওয়া হয় এবং পরে আট ডিজিএফআইয়ের বন্দিশালা আয়নাঘরে তাকে গুম করে রাখা হয়। তিনি অভিযোগ করেন, আটকের সময় তাকে অবৈধভাবে বন্দি রাখা হয়েছিল এবং জিজ্ঞাসাবাদে বারবার ভারতের বিরুদ্ধে লেখালেখির বিষয়টি তুলে ধরে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।
জবানবন্দিতে আযমী বলেন, জিজ্ঞাসাবাদকারীদের তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, ভারতের বিরুদ্ধে লেখালেখি যদি দণ্ডনীয় অপরাধ হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হোক। কিন্তু তাকে কেন অবৈধভাবে আটকে রাখা হয়েছে, সেই প্রশ্নও তিনি তোলেন। তিনি আরও বলেন, সেনাবাহিনীর ৩০ বছরের চাকরিতে তাকে যে শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল, সেই শিক্ষা অনুযায়ী ভারতকে প্রধান শত্রু হিসেবে দেখা হতো। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যদি এই ধারণা অপরাধ হয়, তাহলে একই অপরাধে বহু সেনা কর্মকর্তা এবং দীর্ঘদিন ধরে যারা এই শিক্ষা দিয়েছেন তারাও দায়ী হবেন।
আযমী জানান, রোববার তিনি প্রথম দিনের জবানবন্দি দেন, তবে জবানবন্দি শেষ না হওয়ায় সোমবার তিনি অবশিষ্ট অংশ উপস্থাপন করেন। তিনি তার আটকের সময়কার অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, সেখানে ব্যবহৃত তোশকে শত শত ছারপোকা ছিল এবং কামড়ে তার কাপড় রক্তাক্ত হয়ে যেত। রক্তমাখা কাপড় নিয়ে নামাজ আদায়ে সমস্যা হওয়ায় তিনি পৃথক লুঙ্গি চাইলে তা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, আগে দেওয়া কাপড় নিম্নমানের ছিল এবং ব্যবহারে ছিঁড়ে গেলে সেলাইয়ের জন্য সুতা চাইলেও তা দেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত ছেঁড়া কাপড় গিট দিয়ে ব্যবহার করতে হয়েছে বলে তিনি জানান।
জবানবন্দিতে তিনি আরও বলেন, অপহরণের এক মাস পর ২১ সেপ্টেম্বর রাত ১১টা ৫০ মিনিটে একজন কর্মকর্তা তাকে জানান, একটি অঘটন ঘটার আশঙ্কায় তাকে নিয়ে আসা হয়েছিল এবং সেই আশঙ্কা কেটে যাওয়ায় মুক্তি দেওয়ার সময় এসেছে। তখন তিনি জানতে চান, মুক্তির জন্য তিনি দিন না ঘণ্টা গুণবেন। জবাবে ওই কর্মকর্তা বলেন, তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আসতে হবে এবং তিনি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারবেন না।
আযমী বলেন, ২০২২ সালের এক জিজ্ঞাসাবাদে তার বিভিন্ন পরিচয় ও যোগাযোগ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়। তবে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন করা হয় জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে তার সম্পর্ক আছে কি না। তিনি জানান, সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়ার সাত বছর দুই মাস পর তাকে অপহরণ করা হয়েছে এবং এই দীর্ঘ সময় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তার ওপর নজরদারি করেছে। তাই জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলে তার কোনো প্রমাণ থাকার কথা, এমন যুক্তিও তিনি তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, তার বাবা জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা আমির হলেও তার নিজের সঙ্গে ওই দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি দাবি করেন, সম্পর্ক না থাকলে দলটির আমির হওয়ার প্রশ্নই অবাস্তব। এরপর আবার ভারতের বিরুদ্ধে লেখালেখির প্রসঙ্গ তুলে তাকে চাপ দেওয়া হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, এক পর্যায়ে তিনি জানতে চান, তারা তাকে হত্যা করবে কি না। জবাবে জিজ্ঞাসাবাদকারীরা বলেন, তারা চাইলে আগেই তাকে হত্যা করতে পারত।
জবানবন্দি শেষে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাকে জেরা করবেন বলে জানানো হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল ১ আগামী বৃহস্পতিবার জেরার জন্য দিন নির্ধারণ করেছে।
সবশেষে বলা যায়, বিচারপ্রক্রিয়ায় সাক্ষ্যের প্রতিটি শব্দ শুধু একটি ব্যক্তির অভিজ্ঞতা নয়, তা সময়ের সামনে সত্যের দায়বদ্ধতা তুলে ধরে, আর সেই সত্য প্রতিষ্ঠিত হলেই মানুষ নতুন করে ন্যায়ের ওপর ভরসা করতে শেখে।