তেরতম তারাবি, দাওয়াতের পথে অবিচল থাকার শিক্ষা
পবিত্র রমজানের তেরতম তারাবিতে আজ সূরা কাহফের ৭৫ থেকে ১১০ নম্বর আয়াত, পূর্ণ সূরা মারইয়াম এবং সূরা ত্বহার প্রথমাংশ তেলাওয়াত করা হবে। এদিন ১৬তম পারা সম্পন্ন হবে। আলোচিত আয়াতগুলোতে ঈমান, তাওহিদ, নবীদের সংগ্রাম, আখিরাতের জবাবদিহি এবং দাওয়াতের কাজে ধৈর্য ও দৃঢ়তার গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা উঠে এসেছে।
সূরা কাহফের আলোচ্য অংশে হজরত মুসা ও হজরত খিজরের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। জ্ঞান অনুসন্ধানে মুসা আলাইহিস সালাম দীর্ঘ সফরে সঙ্গী হন খিজরের। সফরের পথে ঘটে যাওয়া একাধিক ঘটনার বাহ্যিক রূপ ছিল বিস্ময়কর, কিন্তু প্রতিটির অন্তরালে ছিল গভীর হিকমত। এই কাহিনি মানুষের সীমিত জ্ঞান ও আল্লাহর অসীম প্রজ্ঞার পার্থক্য তুলে ধরে এবং শিক্ষা দেয়, দৃশ্যমান বাস্তবতার আড়ালে অনেক সময় অদৃশ্য রহস্য লুকিয়ে থাকে।
একই সূরায় বাদশাহ জুলকারনাইনের ঘটনাও উল্লেখ রয়েছে। আল্লাহপ্রদত্ত ক্ষমতা ও সামর্থ্য নিয়ে তিনি বিস্তীর্ণ অঞ্চল শাসন করেন এবং ইয়াজুজ মাজুজের আক্রমণে বিপর্যস্ত এক জনগোষ্ঠীর অনুরোধে তাদের সুরক্ষায় শক্ত প্রাচীর নির্মাণ করেন। কেয়ামতের পূর্বে এই প্রাচীর ভেঙে যাবে এবং ইয়াজুজ মাজুজ পুনরায় পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে বলে কোরআনে বর্ণনা এসেছে। সূরার সমাপ্তিতে ঘোষণা করা হয়েছে, যারা রবের সাক্ষাৎ প্রত্যাশা করে তারা যেন সৎকর্মে অটল থাকে এবং ইবাদতে কোনো অংশীদার স্থাপন না করে।
সূরা মারইয়ামে আল্লাহর একত্ববাদ, পুনরুত্থান ও হিসাব নিকাশের বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। এখানে একাধিক নবীর জীবনের দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়েছে। হজরত জাকারিয়া বার্ধক্যে উপনীত হয়ে সন্তানের জন্য দোয়া করেন এবং মানবিক দৃষ্টিতে অসম্ভব পরিস্থিতিতেও আল্লাহ তাকে ইয়াহইয়া নামে পুত্র দান করেন। হজরত ঈসার অলৌকিক জন্ম ও শৈশবে মায়ের পবিত্রতার পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ার ঘটনা আল্লাহর কুদরতের পরিচয় বহন করে।
হজরত ইবরাহিম তার পিতাকে একত্ববাদের আহ্বান জানান, কিন্তু প্রত্যাখ্যাত হয়ে ঈমান রক্ষায় দেশত্যাগ করেন। পরবর্তীতে তার বংশ থেকেই বহু নবীর আগমন ঘটে। একই সূরায় মুসা, হারুন, ইসমাইল ও ইদরিস আলাইহিমুস সালামের কথাও উল্লেখ রয়েছে। তবে পরবর্তী প্রজন্মের কিছু মানুষের নামাজ অবহেলা ও প্রবৃত্তির অনুসরণের কথাও সতর্কবার্তা হিসেবে এসেছে। যারা আখিরাত অস্বীকার করে তাদের পরিণতি সম্পর্কে কঠোর সতর্কতা দেওয়া হয়েছে এবং মুমিনদের জন্য বিশেষ ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি উল্লেখ করা হয়েছে।
সূরা ত্বহা মূলত হজরত মুসার জীবনের বিস্তৃত বর্ণনা বহন করে। নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাওয়াতের পথে যে কষ্ট সহ্য করেছেন, সূরার শুরুতে তাকে সান্ত্বনা দেওয়া হয়েছে। এতে বোঝানো হয়েছে, আল্লাহ তার প্রিয় বান্দাদের কখনো একা ছেড়ে দেন না। শিশু মুসাকে নদীতে নিক্ষেপ, শত্রুর গৃহে লালনপালন, নবুয়ত প্রাপ্তি, ফেরাউনের মুখোমুখি হওয়া, জাদুকরদের পরাজয়, বনি ইসরাইলের মুক্তি এবং ফেরাউন বাহিনীর ধ্বংসসহ নানা ঘটনা এখানে বর্ণিত হয়েছে।
একই সঙ্গে বনি ইসরাইলের অকৃতজ্ঞতা, সামিরির প্ররোচনায় পথভ্রষ্ট হওয়া এবং পরবর্তীতে তাওরাত নিয়ে মুসার প্রত্যাবর্তনের ঘটনাও উল্লেখ রয়েছে। সূরার শেষাংশে কেয়ামতের ভয়াবহতা, অবাধ্যদের শাস্তি এবং আদম আলাইহিস সালামের ঘটনা তুলে ধরে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে, শিরক ও অবাধ্যতার পরিণতি কঠিন। পাশাপাশি নবী ও তার অনুসারীদের উদ্দেশে বলা হয়েছে, বিরুদ্ধতার মুখেও দাওয়াতের কাজে অবিচল থাকতে হবে।
তেরতম তারাবির তেলাওয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, জ্ঞানার্জন, ধৈর্য, তাওহিদে অটল থাকা এবং আল্লাহর ওপর ভরসাই মুমিনের শক্তি। অস্থির পৃথিবীতে ঈমানের আলো জ্বালিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন দৃঢ়তা ও অবিচলতা। দাওয়াতের পথে বাধা আসবেই, কিন্তু আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য, যারা স্থির থাকে তারাই শেষ পর্যন্ত সফল হয়।