রমজানের চেতনায় ন্যায়, সংযম ও মানবিক সমাজ গঠনের অঙ্গীকার হেলাল উদ্দিন আহমদ
পবিত্র রমজান আমাদের জীবনে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে আসে। এই মাস কেবল উপবাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধি, আত্মসংযম ও তাকওয়া অর্জনের এক অনন্য সুযোগ। মহান আল্লাহ তাআলা রোজাকে ফরজ করেছেন যেন আমরা মুত্তাকি হতে পারি। অর্থাৎ রমজানের মূল শিক্ষা হলো নিজের ভেতরকার অন্যায়, লোভ, হিংসা ও অহংকারকে দমন করে সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পথে চলা।
রমজান আমাদের ক্ষুধার কষ্ট অনুভব করতে শেখায়। একজন রোজাদার যখন দিনের পর দিন পানাহার থেকে বিরত থাকে, তখন সে উপলব্ধি করতে পারে সমাজের সেইসব মানুষের যন্ত্রণা, যারা প্রতিদিন অভাবের সঙ্গে লড়াই করে। এই উপলব্ধিই আমাদের দায়িত্বশীল করে তোলে। তাই রমজান মানেই দান, যাকাত, ফিতরা ও সহমর্মিতার চর্চা। সমাজের বিত্তবানরা যদি আন্তরিকতার সঙ্গে তাদের দায়িত্ব পালন করেন, তবে দারিদ্র্য ও বৈষম্য অনেকাংশে লাঘব হতে পারে।
ইসলাম শান্তি ও ন্যায়ের ধর্ম। এখানে জুলুমের কোনো স্থান নেই, প্রতারণার কোনো স্থান নেই, অন্যায় উপার্জনের কোনো স্থান নেই। রমজান আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সততা ও ন্যায়পরায়ণতা অপরিহার্য। একজন মুসলমান হিসেবে যেমন আমাদের নামাজ, রোজা ও ইবাদতের প্রতি যত্নবান হতে হবে, তেমনি আমাদের চরিত্র, আচরণ ও লেনদেনেও ইসলামের আদর্শ প্রতিফলিত হতে হবে।
আজকের সমাজে আমরা নানা সংকটের মুখোমুখি। দ্রব্যমূল্যের চাপ, নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক বৈষম্য ও পারস্পরিক অবিশ্বাস আমাদের সামষ্টিক জীবনে প্রভাব ফেলছে। এই প্রেক্ষাপটে রমজান আমাদের জন্য এক আত্মসমালোচনার সময়। আমরা কি সত্যিই ইসলামের শিক্ষাকে আমাদের জীবনে ধারণ করছি। আমরা কি আমাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছি। রমজানের শিক্ষা যদি কেবল ইফতার ও সেহরির আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তার প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ হবে না।
পবিত্র কোরআন নাজিলের মাস রমজান। কোরআন মানবজাতির জন্য হেদায়াত ও পথনির্দেশ। তাই এই মাসে কোরআনের আলোকে ব্যক্তি ও সমাজকে গড়ে তোলার অঙ্গীকার গ্রহণ করা জরুরি। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি পরিহার, আমানত রক্ষা এবং মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা ইসলামের মৌলিক শিক্ষা। আমরা যদি প্রত্যেকে নিজের অবস্থান থেকে এই নীতিগুলো অনুসরণ করি, তবে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
রমজান আমাদের ঐক্যের শিক্ষা দেয়। মসজিদে এক কাতারে দাঁড়িয়ে ধনী গরিব, ছোট বড়, পদমর্যাদার ভেদাভেদ ভুলে সবাই একসঙ্গে ইবাদত করি। এই দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বিভেদ নয়, ভ্রাতৃত্বই আমাদের শক্তি। জাতীয় জীবনে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহনশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু তা যেন বিদ্বেষে রূপ না নেয়। আমরা যেন ভিন্নমতকে সম্মান করতে শিখি এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সংস্কৃতি গড়ে তুলি।
সিলেটের মানুষ ধর্মপ্রাণ ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ। এই পবিত্র মাসে আমি সিলেটবাসীর প্রতি আহ্বান জানাই, আমরা যেন নিজেদের ইবাদতের পাশাপাশি সমাজের অবহেলিত মানুষের খোঁজখবর নিই। একজন প্রতিবেশী অভুক্ত থাকলে আমাদের ইবাদত পরিপূর্ণ হতে পারে না। আমাদের ঘরে ইফতারের আয়োজন থাকলে, সেই আনন্দ যেন আশেপাশের মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে।
সবশেষে, পবিত্র রমজানের শিক্ষাকে আমরা যেন সারা বছরের জীবনে ধারণ করি। রমজান শেষে যদি আমাদের চরিত্র, আচরণ ও সামাজিক দায়বদ্ধতায় পরিবর্তন না আসে, তবে আমরা এই মহিমান্বিত মাসের প্রকৃত সুফল থেকে বঞ্চিত হব। আসুন, আমরা আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পাশাপাশি একটি ন্যায়ভিত্তিক, সহমর্মিতাপূর্ণ ও মানবিক সমাজ গঠনের অঙ্গীকার করি।
মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে রমজানের পূর্ণ ফজিলত অর্জনের তৌফিক দান করুন এবং আমাদের ব্যক্তি ও সামষ্টিক জীবনকে শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণে ভরিয়ে দিন। আমিন।