টানা পাঁচ মাসে রপ্তানি আয়ে ধস, ডিসেম্বরে কমেছে ১৪ শতাংশ
দেশের রপ্তানি আয়ে টানা পাঁচ মাস ধরে নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া এবং ইউরোপীয় বাজারে চীন ও ভারতের আগ্রাসী বাজার সম্প্রসারণের ফলে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়াকে এই পতনের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
রোববার ৪ জানুয়ারি রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ইপিবি প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যে জানানো হয়, চলতি বছরের ডিসেম্বরে দেশের রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারে। আগের বছর ডিসেম্বরে এই আয় ছিল ৪ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার। এর আগের মাস নভেম্বরে রপ্তানি কমেছিল ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস অর্থাৎ জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে মোট রপ্তানি আয় ২ দশমিক ১৯ শতাংশ কমে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এই খাতেই সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে। ডিসেম্বরে তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ শতাংশের বেশি কমেছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ওই মাসে পোশাক রপ্তানি আয় ছিল ৩ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার, যেখানে আগের বছর তা ছিল ৩ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অর্ডার কমে যাওয়ায় ছোট ও মাঝারি পোশাক কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে উৎপাদন সক্ষমতা ও মুনাফা দুটোই কমছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহমুদ হাসান বাবু বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত পারস্পরিক শুল্কের কারণে সে দেশের বাজারে চাহিদা কমে গেছে। একই সঙ্গে চীন ও ভারত ইউরোপীয় বাজারে আগ্রাসীভাবে পণ্য সরবরাহ করছে। ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমছে। তিনি আরও জানান, সরকারের কিছু নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়াও রপ্তানি হ্রাসে ভূমিকা রেখেছে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে রপ্তানি আয় ধরে রাখতে হলে সরকারকে ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়াতে হবে। যেখানে বাংলাদেশে প্রণোদনা কমানো হচ্ছে, সেখানে ভারত প্রণোদনা বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি শ্রম আইন পরিবর্তনের ফলে ব্যবসার খরচ বেড়েছে। তাই ব্যয় কমিয়ে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ প্রয়োজন।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে তৈরি পোশাক খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ১৯ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৯ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২০ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক আরোপ করায় মোট শুল্ক দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশে, যা বাজারে প্রবেশে বড় বাধা তৈরি করেছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, রপ্তানি আয় কমে গেলে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে চাপ সৃষ্টি হবে। তখন আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে অর্থ ব্যয় করতে হবে, যা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক নয়। তিনি নতুন বাজার ও নতুন পণ্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
এদিকে তৈরি পোশাকের বাইরে কিছু খাতে মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। হিমায়িত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য এবং ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যের রপ্তানি কিছু ক্ষেত্রে বেড়েছে। তবে কৃষিপণ্য, প্লাস্টিক পণ্য, জুতা, সিরামিক ও বিশেষায়িত টেক্সটাইল পণ্যের রপ্তানি কমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নীতি সহায়তা ও বাজার বৈচিত্র্য না বাড়াতে পারলে রপ্তানি আয়ের এই চাপ আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।