রেকর্ড আমদানি তবু রমজানে নিত্যপণ্যের বাজার অস্থির
রমজানকে সামনে রেখে রেকর্ড পরিমাণ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি হলেও বাজারে তার সুফল মিলছে না। দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে গুদামভর্তি পণ্য এবং বেড়েছে বেচাকেনা, কিন্তু রহস্যজনকভাবে বাড়ছে দাম। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও কেন বাজার নিয়ন্ত্রণে আসছে না— এমন প্রশ্ন এখন ক্রেতা ও সংশ্লিষ্টদের।
বুধবার সকালে সরেজমিনে খাতুনগঞ্জ এলাকায় দেখা যায়, প্রতিটি আড়ত ও গুদাম পণ্যে পরিপূর্ণ। বাজারের ভেতরের সড়ক ছাড়িয়ে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের দীর্ঘ সারি পৌঁছেছে জেলগেট পর্যন্ত। শ্রমিকরা মাথায় করে পণ্য বহন করছেন, কোথাও ঠেলাগাড়িতে চলছে সরবরাহ। আড়তগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় এবং জমজমাট লেনদেনের চিত্র দেখা গেছে।
তবে সরবরাহ ও বিক্রি বাড়লেও দামে তার প্রতিফলন নেই। বরং বেশিরভাগ পণ্যের দাম বেড়েছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা নিয়মিত অভিযান ও জরিমানা করলেও মূল্যবৃদ্ধির লাগাম টানা যাচ্ছে না। ক্রেতাদের অভিযোগ, নির্বাচনের পর ছয় দিনের ব্যবধানে কেজিপ্রতি ৫ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বিভিন্ন পণ্যের দাম। আগে চট্টগ্রাম বন্দরের অচলাবস্থা ও সরকারি ছুটিকে কারণ হিসেবে দেখানো হলেও বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক।
খাতুনগঞ্জে ব্যবসা মূলত কমিশনভিত্তিক। বড় আমদানিকারকেরা আড়তদারদের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করেন। তবে কিছু ব্যবসায়ী সরাসরি আমদানিও করছেন। ব্যবসায়ীদের দাবি, এবার রমজান উপলক্ষে অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশি পণ্য আমদানি হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনের পর বাজার সচল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমদানিকারকেরা উচ্চমূল্যে পণ্য ছাড়ছেন।
খাতুনগঞ্জ আড়তদার সমিতির সাবেক সভাপতি সোলাইমান বাদশা জানান, বাজারে পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনের পর হঠাৎ বেশি দামে পণ্য বিক্রির নির্দেশ এসেছে। তার মতে, মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিক কারণ নেই।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সাধারণ মানের ছোলা কেজি ৬৫ থেকে ৭০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৭৪ থেকে ৭৫ টাকা। ভালো মানের ছোলা ৭৪ থেকে ৭৫ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০ থেকে ৮২ টাকায়। ৭৪ টাকার মটর ডাল এখন ৭৮ টাকা এবং ৭৫ টাকার মসুর ডাল ৮১ থেকে ৮২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ছোলা মণপ্রতি চার হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে চার হাজার ২০০ টাকা। শুকনো মরিচ কেজিতে ৪০ টাকা বেড়ে ৩৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
রমজানের অন্যতম চাহিদাসম্পন্ন পণ্য খেজুরের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। দুই মাস আগে শুল্কহার ১০ শতাংশ কমানোর পর ৪৭ হাজার ৭৩ টন খেজুর আমদানি হয়। প্রথমদিকে দাম কিছুটা কমলেও বর্তমানে মানভেদে কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস সূত্রে জানা গেছে, রমজানে দেশে প্রায় ৩ লাখ টন ভোজ্য তেল, আড়াই লাখ টন চিনি, ১ লাখ টন ছোলা এবং ৮০ থেকে ৯০ হাজার টন খেজুরের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে রমজানের আগেই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে খালাস হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার টন ছোলা, ১০ লাখ ৩৮ হাজার টন ভোজ্য তেল, ৩ লাখ টন চিনি এবং প্রায় ১ লাখ টন খেজুর। সহকারী কমিশনার শরীফ মো. আল আমিন বলেন, আমদানির পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাজারে সংকটের আশঙ্কা নেই।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ চট্টগ্রামের সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, রমজানকে ঘিরে প্রতিবছরের মতো এবারও সিন্ডিকেটের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। তার মতে, প্রশাসনের নজরদারি জোরদার না হলে মধ্য রমজান পর্যন্ত মূল্য ঊর্ধ্বমুখী থাকতে পারে।
রেকর্ড আমদানির পরও যদি বাজারে স্বস্তি না ফেরে, তবে তা শুধু পরিসংখ্যানের সাফল্য নয়, সাধারণ মানুষের নিত্যজীবনের বাস্তবতার সঙ্গেই এক গভীর বৈপরীত্য তৈরি করে।