বিশ্ববাজারে সোনার দাম কীভাবে নির্ধারিত হয়
গত এক বছর ধরে বিশ্ববাজারে সোনার দাম ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতিকে ঘিরে অস্থিরতার কারণে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনার দিকে ঝুঁকছেন। ফলে সোনার প্রতি আকর্ষণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে সোনা, রুপা ও প্লাটিনামের মতো মূল্যবান ধাতুর ওজন সাধারণত ট্রয় আউন্সে নির্ধারণ করা হয়। এক ট্রয় আউন্স সমান ৩১ দশমিক ১০৩৫ গ্রাম। উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়, যদি প্রতি ট্রয় আউন্স সোনার দাম ৫ হাজার ডলার হয়, তবে প্রতি গ্রাম সোনার দাম প্রায় ১৬০ ডলার দাঁড়ায়। সে হিসাবে এক কেজি ওজনের সোনার বারের মূল্য প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার ডলার হতে পারে।
ট্রয় আউন্স ও সাধারণ আউন্সের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সাধারণ আউন্সের ওজন ২৮ দশমিক ৩৫ গ্রাম, যা সাধারণত খাদ্য ও দৈনন্দিন পণ্যের ওজন পরিমাপে ব্যবহৃত হয়।
দেশীয় বাজারে সোনার দামের ক্ষেত্রে ক্যারেট একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ২৪ ক্যারেট সোনা হলো খাঁটি সোনা। ২২, ২১ বা ১৮ ক্যারেট সোনায় নির্দিষ্ট পরিমাণে রুপা, তামা বা দস্তার মতো অন্যান্য ধাতু মেশানো থাকে। এছাড়া ১৪ ক্যারেট সোনা প্রায় ৫৮ দশমিক ৩ শতাংশ বিশুদ্ধ এবং ১০ ক্যারেট সোনা প্রায় ৪১ দশমিক ৭ শতাংশ বিশুদ্ধ।
গয়নার দাম নির্ধারণে সাধারণত তিনটি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়—সেদিনের আন্তর্জাতিক স্পট মূল্য, কারিগরি খরচ এবং প্রযোজ্য কর। স্পট মার্কেটের মূল্যে দরকষাকষির সুযোগ না থাকলেও কারিগরি খরচ নিয়ে অনেক সময় আলোচনা করা যায়।
আন্তর্জাতিকভাবে লন্ডন ও নিউইয়র্কের মতো বড় এক্সচেঞ্জে প্রতি ট্রয় আউন্স সোনার স্পট মূল্য মার্কিন ডলারে নির্ধারিত হয়। এরপর বিভিন্ন দেশের বাজারে সেই মূল্য স্থানীয় মুদ্রায় রূপান্তর করা হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবহন ব্যয়, আমদানি শুল্ক এবং বাজারভিত্তিক প্রিমিয়াম।
শুল্কনীতি দেশভেদে ভিন্ন। উদাহরণস্বরূপ, ভারতে সোনার ওপর ৩ শতাংশ জিএসটি আরোপ করা হয়। অন্যদিকে যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে সোনা কেনার ক্ষেত্রে কর ছাড়ের সুযোগ রয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যগত গুরুত্ব বিবেচনায় স্বর্ণমুদ্রা ও স্বর্ণবার তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের গোল্ড ইগল, চীনের গোল্ড পান্ডা এবং দক্ষিণ আফ্রিকার করুগারর্যান্ড আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সোনার রিজার্ভ বৃদ্ধি করেছে, যা দামের ওপর প্রভাব ফেলেছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সবচেয়ে বেশি সোনা রয়েছে, প্রায় ৮ হাজার ১৩৩ টন। দ্বিতীয় অবস্থানে জার্মানি, তাদের মজুত প্রায় ৩ হাজার ৩৫০ টন। তৃতীয় স্থানে ইতালি, যার কাছে রয়েছে প্রায় ২ হাজার ৪৫১ টন সোনা।
বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তার সময়ে সোনা কেবল অলংকার নয়, বরং আস্থা ও নিরাপত্তার প্রতীক হয়ে ওঠে—আর সেই আস্থাই বাজারে এর মূল্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।