বাজার থেকে আরও ২১ কোটি ৮৫ লাখ ডলার কিনল বাংলাদেশ ব্যাংক, চলতি অর্থবছরে মোট ক্রয় ৪ দশমিক ১৫ বিলিয়ন
দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখতে ১৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে আরও ২১ কোটি ৮৫ লাখ মার্কিন ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মোট ডলার ক্রয় দাঁড়িয়েছে ৪১৫ কোটি ডলার বা ৪ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ডলারের সরবরাহ তুলনামূলকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বাজারে দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সে কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজ উদ্যোগে বাজার থেকে ডলার কিনে ভারসাম্য বজায় রাখছে।
জানা গেছে, ২০২২ সালে দেশের ডলার বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে এবং ডলারের দাম ৮৫ টাকা থেকে বেড়ে এক পর্যায়ে ১২২ টাকায় পৌঁছায়। তখনকার সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানা পদক্ষেপ নিলেও বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি শুরু করা হয়। তবুও বাজারে কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা ফিরে আসেনি বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে। এর মধ্যে ২০২১ ২২ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, ২০২২ ২৩ অর্থবছরে ১৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৩ ২৪ অর্থবছরে ১২ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করা হয়। অথচ একই সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিনেছে প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের মতো।
তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি বদলেছে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অর্থপাচার বন্ধে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে, যার প্রভাবে রপ্তানি আয় এবং প্রবাসী আয় উভয়ই বেড়েছে। এতে বাজারে ডলারের সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সরবরাহ বাড়লেও চাহিদা সে অনুপাতে না বাড়ায় ডলারের দাম কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এই অবস্থায় ডলারের দর স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, বর্তমানে ডলারের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি থাকায় দাম যেন অস্বাভাবিকভাবে কমে না যায়, সেজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার ক্রয় করছে। তিনি জানান, ডলারের দর কমে গেলে প্রবাসী আয় এবং রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে বাজার থেকে ডলার কেনার ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রবাসীরা দেশে ৩১৭ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৫ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। রেমিট্যান্স বৃদ্ধির পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার ক্রয়ের কারণে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে জানানো হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২৯ জানুয়ারি শেষে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার। আর বিপিএম ৬ অনুযায়ী রিজার্ভ রয়েছে ২৮ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার। দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রিজার্ভ ২০২১ সালের আগস্টে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করেছিল। এরপর ধারাবাহিকভাবে কমতে কমতে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের সময় রিজার্ভ নেমে আসে ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে।
সবশেষে বলা যায়, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারের ভারসাম্য ঠিক রাখতে সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্তই অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখে, আর সেই স্থিতিশীলতার ওপরই নির্ভর করে দেশের মানুষের স্বপ্ন আর ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা।