আন্দোলনে স্থবির চট্টগ্রাম বন্দর, শতকোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল এনসিটিতে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ সংক্রান্ত সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে দ্বিতীয় দিনের মতো অবরোধ পালন করছেন বন্দরের শ্রমিক ও কর্মচারীরা। জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদল এবং শ্রমিক কর্মচারী ঐক্যপরিষদের ব্যানারে চলা এই কর্মসূচির কারণে দেশের আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম বন্দরে কার্যত স্থবিরতা নেমে এসেছে। এতে জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী গত শনিবার এবং রোববার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত কর্মবিরতি পালনের কথা থাকলেও বাস্তবে জেটি ছাড়া বন্দরের অন্যান্য অংশে কার্যক্রম প্রায় বন্ধ ছিল। নতুন করে আজ ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সকাল থেকেও একই ধরনের কর্মসূচি চলবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ফলে টানা ৪৮ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম অচল অবস্থায় রয়েছে।
আন্দোলনের পেছনে মূল কারণ হিসেবে জানা গেছে, বন্দরের বিদেশি অপারেটর নিয়োগ সংক্রান্ত একটি রিট মামলার রায় সরকারের পক্ষে যাওয়ার পর এনসিটিকে গ্লোবাল টার্মিনাল অপারেটর প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করে সরকার। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক কর্মচারীদের একটি অংশ। এরই ধারাবাহিকতায় গত শনিবার থেকে কর্মবিরতি ও অবরোধ কর্মসূচি শুরু হয়। এতে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদল ও সিবিএ কর্মসূচি ঘোষণা করলে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদও সংহতি জানায়।
বর্তমানে সীমিত পরিসরে জেটিতে বিদেশগামী মাদার ভেসেলে কন্টেইনার ওঠানামা চালু থাকলেও নতুন করে কোনো পণ্য বন্দরে প্রবেশ করছে না এবং বন্দর থেকে পণ্য ডেলিভারিও বন্ধ রয়েছে। এতে বন্দরের ইয়ার্ড এবং অফডকগুলোতে বড় ধরনের জট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটবে এবং বাজারে অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি হবে।
এদিকে আন্দোলন দমাতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। গত শনিবার চারজনের পর রোববার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া আরও সাতজন শ্রমিক কর্মচারীকে বদলি করা হয়েছে। পাশাপাশি আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ১৮০ জনের একটি তালিকাও প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বন্দর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কঠোর হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশকে চিঠি দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এর পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম বন্দরকে প্রথম শ্রেণির কেপিআইভুক্ত প্রতিষ্ঠান উল্লেখ করে বন্দর এলাকায় মিছিল সমাবেশ এবং রাজনৈতিক কর্মসূচির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে পুলিশ। পাশাপাশি বন্দর ভবন এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের মুখপাত্র এবং পরিচালক প্রশাসন ওমর ফারুক জানান, শ্রমিক কর্মচারীদের একাংশ কাজে যোগ না দিলেও আরেক অংশ অপারেশনে রয়েছে। এতে কার্যক্রমের গতি কমলেও কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তিনি বলেন, অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মসূচির কারণে বন্দরে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা নিরূপণের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বদলির বিষয়ে তিনি বলেন, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং বন্দরের কাজ স্বাভাবিক রাখতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং শ্রমিকদল নেতা শেখ নুরুল্লাহ বাহার বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরকে বিদেশিদের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রতিবাদে তাদের কর্মসূচি চলছে এবং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা মাঠ ছাড়বেন না। তিনি বলেন, বদলির তালিকা তৈরিতে তারা ভয় পান না এবং আন্দোলন অব্যাহত রাখার বিষয়ে সবাই ঐক্যবদ্ধ।
বন্দর ব্যবহারকারীরাও এই পরিস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তৈরি পোশাক শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন্দর অচল থাকলে সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়বে রপ্তানিনির্ভর শিল্প। বিজিএমইএর সাবেক সহ সভাপতি রকিবুল আলম খন্দকার বলেন, অতীতেও বিভিন্ন ইস্যুতে কর্মবিরতি হয়েছে, তবে তখন সংকট নিরসনে দুই পক্ষই নমনীয় ছিল। এবার দুই পক্ষই অনড় অবস্থানে থাকায় জাতীয় অর্থনীতি ক্ষতির মুখে পড়ছে। তিনি মনে করেন, তিন দিন বন্দর বন্ধ থাকার প্রভাব বহুদিন ধরে ভোগ করতে হবে এবং ক্ষতির পরিমাণ শত কোটি টাকার কম নয়।
বেসরকারি কন্টেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন বিকডার সেক্রেটারি রুহুল আমিন শিকদার বলেন, দ্রুত সংকট সমাধান না হলে রমজান মাসে বাজার অস্থির হয়ে উঠতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তি হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম বন্দরের প্রতিটি ঘণ্টার কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি আয় এবং সাধারণ মানুষের বাজার ব্যয়, আর তাই দ্রুত সমাধান না এলে ক্ষতির বোঝা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে পুরো জাতির কাঁধেই।