বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসে বাংলাদেশের মধ্যমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্ভাবনা শক্তিশালী
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টস প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মধ্যমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্ভাবনার উন্নতি হয়েছে এবং আগামী দুই অর্থবছরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে জোরদার হতে পারে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্তর্নিহিত শক্তি ও সম্ভাবনার কারণে পূর্বাভাস আংশিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী সংশোধন করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের নতুন হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশে উন্নীত হতে পারে এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা আরও বেড়ে ৬ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
এই সংশোধনের পেছনে মূল্যস্ফীতির চাপ কমে আসায় ব্যক্তিগত ভোগব্যয় বৃদ্ধি, শিল্প খাতে কার্যক্রম জোরদার হওয়া এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রত্যাশার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের শুরুতে সাধারণ নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা হ্রাস এবং নতুন সরকারের মাধ্যমে কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নের সম্ভাবনা ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিল্প সম্প্রসারণে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ছাড়া সরকারি ব্যয় ও বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধিও পূর্বাভাসের তুলনায় দ্রুততর হবে বলে বিশ্বব্যাংক আশা করছে। জুন মাসে প্রকাশিত পূর্বাভাসের তুলনায় ২০২৭ সালের জন্য বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির অনুমান ০ দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্ট বাড়ানো হয়েছে।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলমান বাণিজ্য উত্তেজনা ও নীতিগত অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও বিশ্ব অর্থনীতি প্রত্যাশার তুলনায় কিছুটা বেশি স্থিতিস্থাপকতা দেখাচ্ছে। তবে বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমে ২ দশমিক ৬ শতাংশে নামতে পারে এবং ২০২৭ সালে তা সামান্য বেড়ে ২ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
একই সঙ্গে সতর্ক করে বলা হয়েছে, বর্তমান প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২০-এর দশকটি ১৯৬০-এর দশকের পর বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির দিক থেকে সবচেয়ে দুর্বল দশক হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালে প্রত্যাশিত নীতিগত পরিবর্তনের আগে বাণিজ্যে অগ্রিম তৎপরতা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে দ্রুত সমন্বয় সাময়িকভাবে প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করেছিল। তবে ২০২৬ সালে এসব প্রণোদনা কমে যেতে পারে, কারণ বাণিজ্য গতি শ্লথ হওয়ার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে বৈশ্বিক আর্থিক অবস্থার কিছুটা শিথিলতা এবং কয়েকটি বড় অর্থনীতিতে রাজস্ব সম্প্রসারণ এই মন্দার প্রভাব আংশিকভাবে কমাতে পারে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ২০২৬ সালে কমে ২ দশমিক ৬ শতাংশে নামতে পারে, যার পেছনে শ্রমবাজারের শীতলতা এবং জ্বালানি দামের নিম্নমুখী প্রবণতা ভূমিকা রাখবে।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রধান অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন অর্থনীতিবিষয়ক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ইন্ডারমিত গিল প্রতিবেদনে বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতি প্রবৃদ্ধি সৃষ্টিতে তুলনামূলকভাবে কম সক্ষম হলেও নীতিগত অনিশ্চয়তার প্রভাব মোকাবিলায় কিছুটা বেশি স্থিতিস্থাপক হয়ে উঠছে।
তবে তিনি সতর্ক করেন, ধীরগতির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি ঋণের রেকর্ড উচ্চমাত্রা যুক্ত হলে তা সরকারি অর্থব্যবস্থা ও ঋণবাজারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে রাজস্ব চাপ বাড়ছে এবং সরকারি ঋণ গত অর্ধশতকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের উপপ্রধান অর্থনীতিবিদ ও প্রসপেক্টস গ্রুপের পরিচালক এম আয়হান কোসে বলেন, উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে সরকারি ঋণের উচ্চমাত্রা রাজস্ব বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধারকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে সামনে এনেছে। তিনি বলেন, কার্যকরভাবে নকশা করা রাজস্ব বিধি ঋণ স্থিতিশীল রাখতে ও নীতিগত সুরক্ষা জোরদারে সহায়তা করতে পারে, তবে এর সাফল্য নির্ভর করে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, বিশ্বাসযোগ্য বাস্তবায়ন এবং টেকসই রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ওপর।