তৃণমূলে ভাঙনের ঝড়, প্রতীক রক্ষায় কঠোর অবস্থানে মমতা
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসকে ঘিরে। দলীয় ভাঙন, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং প্রতীক নিয়ে বিরোধের মধ্যেই কঠোর অবস্থানের বার্তা দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
শনিবার দলীয় সংকট আরও তীব্র হয়ে ওঠে, যখন তৃণমূলের রাজ্য সভানেত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য পদত্যাগের ঘোষণা দেন। পরে তিনি বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দেন। এর আগে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নেতাকর্মীরা কলকাতার মূল দলীয় কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঘটনাও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
দলীয় প্রতীক ঘাসফুল নিয়ে চলমান বিরোধের মধ্যেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্টভাবে জানান, তৃণমূলের আনুষ্ঠানিক প্রতীক তাঁর নেতৃত্বাধীন অংশের কাছেই থাকবে। একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক লড়াই থেকে সরে না যাওয়ার বার্তাও দেন। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং দলের সাংগঠনিক ভিত্তি কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীর মাধ্যমে দখল করা সম্ভব নয়।
চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের পদত্যাগ প্রসঙ্গে মমতা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি আগে থেকেই অবগত ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, বিদ্রোহী শিবিরের সঙ্গে চন্দ্রিমার পারিবারিক যোগাযোগ আগেই তৈরি হয়েছিল।
এদিকে বিদ্রোহী অংশের পক্ষ থেকে মমতাকে দলের উপদেষ্টা হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। মমতার অভিযোগ, কেন্দ্রীয় চাপ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই দলের একাংশ সরে যাচ্ছে। তবে তিনি দাবি করেন, কোনো চাপের মুখেই তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান বদলাবে না।
দলীয় কার্যালয় নিয়ে বিরোধ প্রসঙ্গে মমতা জানান, সংশ্লিষ্ট ভবনটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বৈধভাবে লিজ নেওয়া রয়েছে এবং সেটি দলীয় সম্পত্তি হিসেবেই ব্যবহৃত হবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকজন নেতা দল ছাড়লেও সংগঠনের সাংগঠনিক অস্তিত্ব শেষ হয়ে যায় না।
২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিদ্রোহী বিধায়কদের উদ্দেশ্যে বলেন, দলীয় প্রতীক এবং মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের অল্প সময়ের মধ্যেই দলত্যাগের ঘটনায় তিনি গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
বর্তমানে জাতীয় ও রাজ্য পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক দায়িত্ব নিজের তত্ত্বাবধানে নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন মমতা। একই সঙ্গে কালীঘাটের নিজ বাসভবন থেকেই দলীয় কার্যক্রম পরিচালনার ঘোষণা দেন তিনি।
তৃণমূলে চলমান এই ভাঙনের পেছনে নেতৃত্বের ধরন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ কাজ করেছে বলে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর দাবি। বিশেষ করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়েও দলের ভেতরে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
এ পর্যন্ত ৬০ জনের বেশি বিধায়ক, ২০ জনের বেশি লোকসভা সদস্য এবং অন্তত তিনজন রাজ্যসভা সদস্য মূল নেতৃত্ব থেকে আলাদা অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
পদত্যাগের পর চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য জানান, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা থাকবে। তবে আস্থার সংকটের কারণেই বর্তমান অবস্থান থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভারতের নির্বাচন কমিশন তৃণমূল কংগ্রেসের দুই পক্ষকে আগামী ৬ জুলাই বিকেল সাড়ে ৫টার মধ্যে নিজ নিজ দাবি এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কমিশনের পরবর্তী সিদ্ধান্ত পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।