ঈদের আগে পেঁয়াজের বাজারে ধস, লোকসানে আগাম ফসল বিক্রি করছেন কৃষক
ঈদকে সামনে রেখে বাজারে পেঁয়াজের দাম হঠাৎ কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন ফরিদপুরের পেঁয়াজ চাষিরা। বিশেষ করে জেলার সালথা ও নগরকান্দা উপজেলার কৃষকেরা আগাম তোলা পেঁয়াজ কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে উৎপাদন খরচ ওঠানোই এখন অনেকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শনিবার ৭ মার্চ স্থানীয় বাজার ও কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে সালথা ও নগরকান্দা উপজেলায় প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের চাষ হয়েছে। প্রতিবছরের মতো এবারও এই দুই উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নে ব্যাপক পরিসরে পেঁয়াজ আবাদ করেছেন কৃষকেরা। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এ বছর ভালো ফলনের সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবে বাজারে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় আগাম পেঁয়াজের দাম কমে গেছে। ফলে প্রত্যাশিত লাভ তো দূরের কথা, অনেক কৃষকই উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না। রমজান মাসে সংসারের বাড়তি ব্যয় মেটাতে অনেকেই অপরিপক্ব পেঁয়াজ তুলে দ্রুত বাজারে বিক্রি করছেন।
শুক্রবার ৬ মার্চ সকালে সালথা উপজেলার গট্টি ইউনিয়নের বালিয়া বাজারে গিয়ে দেখা যায়, ভোর থেকেই কৃষকেরা মাথায় বা ভ্যানে করে পেঁয়াজ নিয়ে বাজারে আসছেন। কিন্তু ক্রেতা কম থাকায় অনেকেই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও ভালো দাম পাচ্ছেন না।
বালিয়া বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি করতে আসা কৃষক মো. শফিকুল ইসলাম জানান, সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি এবং সেচসহ এক মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে প্রায় ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকা খরচ হয়েছে। অথচ বাজারে তা বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৯০০ থেকে ১১০০ টাকায়। ফলে প্রতি মণে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে।
কৃষকদের মতে, বর্তমানে যে পেঁয়াজ বাজারে আসছে সেগুলো পুরোপুরি পরিপক্ব হতে এখনও এক থেকে দেড় মাস সময় লাগবে। অপরিপক্ব অবস্থায় তোলা পেঁয়াজ দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় না এবং দ্রুত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই অনেকেই বাধ্য হয়ে কম দামেই বিক্রি করছেন।
স্থানীয় পেঁয়াজ ব্যবসায়ী আব্দুল খালেক জানান, গত এক সপ্তাহ ধরে বাজারে পেঁয়াজের দাম নিম্নমুখী। বর্তমানে কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ২৫ থেকে ২৬ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে। পরে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে পাঠাতে গিয়ে অনেক সময় আরও কম দামে বিক্রি করতে হয়। তার মতে, প্রতিমণ পেঁয়াজের দাম যদি ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকার মধ্যে থাকে, তাহলে কৃষক ও ব্যবসায়ী উভয়ই কিছুটা লাভবান হতে পারেন।
এ বিষয়ে সালথা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সুদর্শন সিকদার বলেন, পেঁয়াজ তোলার মূল সময় এখনও আসেনি। অনেক কৃষক আগাম পেঁয়াজ তুলছেন, এতে ফলন কম হওয়ার পাশাপাশি বাজারে কম দামও পাচ্ছেন। তাই পেঁয়াজ পরিপক্ব হওয়ার পর উত্তোলনের জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, অনুকূল আবহাওয়া বজায় থাকলে চলতি মৌসুমে সালথা ও নগরকান্দা এলাকায় পেঁয়াজের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বাজারদর স্থিতিশীল না থাকলে সেই সুফল কৃষকেরা পুরোপুরি নাও পেতে পারেন।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো জরুরি। কারণ কৃষকের ঘামে জন্ম নেওয়া প্রতিটি ফসল শুধু একটি পণ্য নয়, এটি একটি পরিবারের আশা, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। সেই স্বপ্নের মূল্য যেন কৃষক ন্যায্যভাবেই পান, এমন প্রত্যাশাই এখন তাদের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা।