চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপের দাবি ডিসিসিআইর, বাস্তবায়ন না হলে ব্যবসা বন্ধের হুঁশিয়ারি
দেশের ব্যবসা ও শিল্পখাত টিকিয়ে রাখতে আইনশৃঙ্খলার দৃশ্যমান উন্নয়ন এবং চাঁদাবাজি সম্পূর্ণ বন্ধের দাবি জানিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ডিসিসিআই। দাবি পূরণ না হলে ব্যবসায়ীরা কার্যক্রম বন্ধের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হতে পারেন বলেও সতর্ক করেছেন সংগঠনের নেতারা।
সোমবার ২৩ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মতিঝিলে ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নবগঠিত সরকারের নিকট ডিসিসিআইর প্রত্যাশা শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব বক্তব্য তুলে ধরা হয়। এতে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক চিত্র উপস্থাপন করেন সংগঠনের সভাপতি তাসকিন আহমেদ।
তিনি বলেন, চাঁদাবাজি এখন ব্যবসার প্রতিটি স্তরে গভীরভাবে প্রভাব ফেলছে। কারখানায় পণ্যবাহী যানবাহন প্রবেশ ও বের হওয়ার ক্ষেত্রেও অবৈধ অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং বাজার ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে উদ্যোক্তাদের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
দুর্নীতি প্রসঙ্গে ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে অনিয়ম ও অস্বচ্ছতার অভিযোগ রয়ে গেছে। পুলিশ, প্রশাসন ও রাজস্ব সংস্থাসহ একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতা জোরদার না হলে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব নয়।
সংগঠনটির দাবি, চাঁদাবাজি ও অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের কারণে ব্যবসার ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা নতুন বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। উৎপাদন পর্যায়ে তুলনামূলক কম দামে পণ্য বিক্রি হলেও অবৈধ আদায় ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে ভোক্তাদের বেশি মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে চার দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কার্যকর উন্নয়ন, চাঁদাবাজি নির্মূল, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত করা এবং বিনিয়োগবান্ধব আর্থিক নীতি প্রণয়ন। পাশাপাশি অনিচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের পুনঃঅর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি এবং ব্যাংক ঋণের সুদহার সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার আহ্বান জানানো হয়।
রাজস্ব কাঠামোর জটিলতা দূর করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাঠামোগত সংস্কার ও অটোমেশন জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তাসকিন আহমেদ। তার মতে, করব্যবস্থাকে সহজ ও স্বচ্ছ করা গেলে কর জিডিপি অনুপাত বাড়ানো সম্ভব।
বিনিয়োগ সহজীকরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সিঙ্গেল উইন্ডো সেবা কার্যকর করার তাগিদও দেওয়া হয়। অতিরিক্ত কাগজপত্র ও দীর্ঘসূত্রতা উদ্যোক্তাদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
শ্রমবাজারের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ জানানো হয়। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ২৬ লাখ মানুষ কর্মহীন অবস্থায় রয়েছে। কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ ও বেসরকারি খাতকে শক্তিশালী করা গেলে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মত দেন ব্যবসায়ী নেতারা।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতির বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে ডিসিসিআই। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত সাম্প্রতিক শুল্কসংক্রান্ত চুক্তি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে সংগঠনটি বলেছে, জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় যেকোনো সিদ্ধান্ত গভীর পর্যালোচনার ভিত্তিতে হওয়া উচিত।
রপ্তানি বহুমুখীকরণে চামড়া, হালকা প্রকৌশলসহ ৩০টি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। পরিকল্পিত সহায়তা ও নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা গেলে উদ্যোক্তাদের আস্থা ফিরবে এবং অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হবে বলে আশা প্রকাশ করেন বক্তারা।
সংবাদ সম্মেলনে ডিসিসিআইর অন্যান্য নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। ব্যবসায়ী সমাজের এই সতর্কবার্তা নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।