জনতার ভালোবাসায় সিক্ত এক আলোকোজ্জ্বল বিদায়, কোম্পানীগঞ্জে নজিরবিহীন মানবিক দৃষ্টান্ত রেখে গেলেন ওসি রতন শেখ পিপিএম
কোম্পানীগঞ্জ থানার পুলিশিং ইতিহাসে এক অনন্য ও স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবেন পুলিশ পরিদর্শক রতন শেখ পিপিএম। যেখানে অতীতে দায়িত্ব পালনকারী প্রায় সব ওসির ক্ষেত্রেই নানা বিতর্ক ও অভিযোগের জন্ম হতো এবং শেষ মুহূর্তে তারা বিতর্কের মধ্য দিয়েই বিদায় নিতেন, ঠিক সেখানে এক ভিন্ন এবং উজ্জ্বল ব্যতিক্রম হয়ে রইলেন তিনি। কোনো ধরনের বিতর্ক, অভিযোগ বা কলঙ্ক ছাড়াই সসম্মানে এবং সাধারণ মানুষের বুকভাঙা ভালোবাসায় কোম্পানীগঞ্জ থেকে বিদায় নিয়েছেন এই সৎ পুলিশ কর্মকর্তা। বর্তমানে তিনি সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানায় ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
রতন শেখ ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর কোম্পানীগঞ্জ থানায় যোগদান করেন। সততা, নিষ্ঠা ও সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালনকালে তিনি সাধারণ মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করেন। নির্বাচনকালীন সময়ে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশব্যাপী থানার অফিসার ইনচার্জদের বদলির অংশ হিসেবে তিনি কোম্পানীগঞ্জ থানা থেকে বদলি হয়ে সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানায় ওসি হিসেবে যোগদান করেন। তাঁর বদলির সংবাদ প্রকাশের পর থেকেই কোম্পানীগঞ্জের সাধারণ মানুষের মধ্যে এক আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এলাকার মানুষ তাঁকে বিদায় দিতে না পেরে আগলে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করেন। তাঁর সততা, অমায়িক ব্যবহার এবং মানবিক গুণাবলীতে মুগ্ধ হয়ে অনেকেই অশ্রুসজল নয়নে তাঁকে বিদায় জানান। আজও এলাকার মানুষের মুখে মুখে তাঁর প্রশংসাসূচক কথা শোনা যায়। যা প্রমাণ করে জনগণের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অর্জনই একজন প্রকৃত জনবান্ধব কর্মকর্তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
ওসি রতন শেখ থানায় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে গতানুগতিক ধারা ভেঙে নতুন ও মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। থানা মানেই সাধারণ মানুষের এক অজানা ভয়। এই ধারণাকে তিনি সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিলেন। তাঁর কিছু অসাধারণ কর্মপদ্ধতি ও মানবিক আচরণ মানুষের মনে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের পরিবর্তে তিনি প্রায়ই থানার খোলা আকাশের নিচে বা বাইরে সাধারণ মানুষের মুখোমুখি বসে তাদের কথা শুনতেন এবং দায়িত্ব পালন করতেন। সাধারণ মানুষ যেন পুলিশের নাম শুনলে বা থানায় আসতে ভয় না পায়, সেই পরিবেশ তিনি নিশ্চিত করেছিলেন। অত্যন্ত সহজ সরল ও বিনয়ী আচরণ দিয়ে তিনি থানায় আসাকে সাধারণ মানুষের জন্য সহজ করে দিয়েছিলেন। কর্মব্যস্ততার মাঝেও আজান পড়লেই তিনি সব কাজ রেখে জামাতে নামাজ আদায় করতে চলে যেতেন। যা স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মানুষের মনে গভীর শ্রদ্ধার সৃষ্টি করেছিল।
কোম্পানীগঞ্জ থানায় ওসি রতন শেখের কার্যক্রম ভবিষ্যৎ পুলিশ কর্মকর্তাদের জন্য একটি বড় শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে থাকবে। কীভাবে সাধারণ মানুষের মন জয় করতে হয়, কীভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার না করে ভালোবাসা দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা যায় এবং কীভাবে একটি থানাকে প্রকৃত জনবান্ধব সেবা কেন্দ্রে রূপান্তর করা যায়, তিনি তার জীবন্ত উদাহরণ রেখে গেছেন। হয়তো ভবিষ্যতে এমন কর্মকর্তা পাওয়া বিরল হবে। তবে রতন শেখ কোম্পানীগঞ্জবাসীর হৃদয়ে চিরকাল একজন আদর্শ ও মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা হয়ে বেঁচে থাকবেন।
বর্তমানে এই মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানায় ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সেখানেও তাঁর সততা, নিষ্ঠা, জনবান্ধব আচরণ ও মানবিক পুলিশিং সাধারণ মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে। স্থানীয়দের অনেকের মুখে একই কথা শোনা যায়। বিশ্বাসের নাম রতন শেখ পিপিএম। মানুষের আস্থা অর্জন করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তিনি একই নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।
রতন শেখ পিপিএম তাঁর কর্মদক্ষতা, সততা এবং সফল নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে চারবার বিভাগের শ্রেষ্ঠ অফিসার ইনচার্জ হিসেবে পুরস্কার পেয়েছেন। এই সম্মাননা তিনি সিলেট রেঞ্জের সম্মানিত ডিআইজি মহোদয়দের হাত থেকে গ্রহণ করেন। এর মধ্যে দুইবার ডিআইজি মুশফিকুর রহমান মহোদয়ের হাত থেকে এবং দুইবার ডিআইজি জিল্লুর রহমান মহোদয়ের হাত থেকে শ্রেষ্ঠ অফিসার ইনচার্জের পুরস্কার গ্রহণ করেন। এই অর্জন তাঁর পেশাগত দক্ষতা, নিষ্ঠা এবং জনবান্ধব পুলিশিংয়ের উজ্জ্বল স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত।
তার এই স্বচ্ছ ও জনসম্পৃক্ত পুলিশিং মানুষের মনে এতটাই জায়গা করে নেয় যে, তিনি যে থানাতেই দায়িত্ব পালন করেছেন, সেখানকার ফেইসবুক পেইজ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাপক মানুষের ভালোবাসা ও সাড়া পেয়েছে। এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মটি শুধু তথ্য ও সংবাদের মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং সাধারণ মানুষের সঙ্গে পুলিশের পারস্পরিক আস্থা ও আন্তরিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। এটি তাঁর প্রতি মানুষের বিশ্বাস ও ভালোবাসার প্রতিফলন।
তাঁর বদলির পরও ফেইসবুক পেইজের মাধ্যমে থানার বিভিন্ন কার্যক্রম, জনসচেতনতামূলক বার্তা এবং সেবামূলক তথ্য সহজেই মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। বর্তমান সময়ে স্বল্প সময়ে এত বিপুলসংখ্যক অনুসারীর আস্থা অর্জন করা সত্যিই বিরল। এটি থানার প্রতি জনগণের বিশ্বাস, সম্পৃক্ততা এবং জনবান্ধব পুলিশিংয়ের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাংলাদেশের অন্যতম বড় থানা মাদারীপুরের শিবচর থানার ওসি থাকাকালে আবেদনক্রমে তিনি সিলেট রেঞ্জে বদলি হন। তাঁর পূর্বের কর্মদক্ষতা, সততা ও সফলতার ভিত্তিতে তৎকালীন ডিআইজি মুশফিকুর রহমানের পরামর্শে পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমান তাঁকে সিলেট জেলার কোম্পানীগঞ্জ থানায় পদায়ন করেন।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পাথর সংশ্লিষ্ট ঘটনাকে কেন্দ্র করে উপজেলা যখন ব্যাপকভাবে আলোচিত ও বিতর্কিত হয়ে ওঠে, তখন সেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে একজন সৎ, দক্ষ ও জনবান্ধব পুলিশ কর্মকর্তার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। রতন শেখের পূর্ববর্তী কর্মস্থলগুলোর সততা, সফলতা ও পেশাগত দক্ষতা বিবেচনায় নিয়ে তাঁকে কোম্পানীগঞ্জ থানায় দায়িত্ব দেওয়া হয়। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি দৃঢ়, নিরপেক্ষ ও আইনানুগভাবে দায়িত্ব পালন করে অপরাধ দমন, জনবান্ধব পুলিশিং এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যেই ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হন।
সাদা পাথর চুরি সংক্রান্ত ঘটনায় পুলিশের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়ার পর কোম্পানীগঞ্জ থানায় যোগদানের কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা পালন করেন। বিভিন্ন অভিযানে আলোচিত ঘটনার সঙ্গে জড়িত একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
এক সময় বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে সড়ক অবরোধ ও ব্যারিকেডের ঘটনা প্রায়ই ঘটত। দায়িত্ব পালনকালে তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন। আইন ভঙ্গের অভিযোগে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তাঁর এই নিরপেক্ষ, সাহসী ও আইনভিত্তিক পদক্ষেপ এলাকায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ওসি সততা ও সাহস নিয়ে কাজ করলে একটি থানার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে ইতিবাচকভাবে পরিবর্তন করা সম্ভব, তার অন্যতম উদাহরণ রতন শেখ। তাঁর কর্মজীবনের বিভিন্ন থানায় দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা, জনবান্ধব পুলিশিং এবং সততার মূল্যায়ন করলে বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়।