সিলেটে দুই ওলির মাজারে মুসল্লিদের ঢল, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে পালিত হচ্ছে শবে বরাত
সিলেটে যথাযোগ্য মর্যাদা ও ধর্মীয় আবহে পালিত হচ্ছে পবিত্র লায়লাতুল বরাত বা শবে বরাত। মঙ্গলবার ৩ ফেব্রুয়ারি সূর্যাস্তের পর থেকে শুরু হওয়া এই পবিত্র রজনী মুসলিম উম্মাহ পালন করছেন গভীর ইবাদত, দোয়া ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে। শবে বরাতের এ রাত পালনের ধারাবাহিকতা থাকবে সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত।
প্রতিবছরের মতো এবারও শবে বরাত উপলক্ষে সিলেটের দুই ওলির মাজারে উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর থেকেই নগরীর দরগাহ গেইট এলাকায় হযরত শাহজালাল রহ এর মাজার এবং খাদিমনগরে হযরত শাহপরান রহ এর মাজারে হাজার হাজার মুসল্লি জড়ো হতে থাকেন। কেউ নফল নামাজে মগ্ন, কেউ জিয়ারত করছেন, আবার অনেকে নীরবে দোয়া ও তওবার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, শবে বরাত উপলক্ষে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা সিলেটের এই দুই মাজারে আসেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। অনেককে এক মাজার থেকে অন্য মাজারে যেতে দেখা যায়, যেখানে তারা আল্লাহর রহমত লাভের আশায় ইবাদত ও দোয়ার মাধ্যমে রাত কাটাচ্ছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মাজার এলাকায় প্রবেশের প্রতিটি গেইটে মুসল্লিদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। একদিকে মানুষ মাজারে প্রবেশ করছেন, অন্যদিকে জিয়ারত শেষে বেরিয়ে যাচ্ছেন। কেউ মাজারসংলগ্ন মসজিদে ইবাদত করছেন, কেউ মাজার ও আশপাশের কবরস্থান জিয়ারত করছেন, আবার অনেকে মাজার চত্বরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
শবে বরাতের এই রাতকে কেন্দ্র করে মাজার এলাকার বাইরে জমে উঠেছে ছোটখাটো বেচাকেনাও। দোকানগুলোতে টুপি, আতর, গোলাপজল, তাসবী, আগরবাতি, মোমবাতিসহ নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি মাজারের প্রবেশপথগুলোতে সারিবদ্ধভাবে বসে থাকা ভিক্ষুকদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ভিক্ষুকরা বেশি দান পাওয়ার আশায় এখানে ভিড় জমিয়েছেন। মাজারে আগত অনেক মানুষ তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী দানও করেছেন।
শুধু মাজারেই নয়, শবে বরাত উপলক্ষে সিলেট নগরীর বিভিন্ন মসজিদেও মুসল্লিদের ভিড় ছিল ব্যাপক। সন্ধ্যার পর থেকেই মুসল্লিরা মসজিদে যেতে থাকেন। কেউ নফল নামাজ আদায় করছেন, কেউ কোরআন তেলাওয়াতে ব্যস্ত, কেউ জিকিরে মগ্ন। অনেকে কবরস্থানে গিয়ে আপনজনদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া ও প্রার্থনা করেন।
মাজার ও মসজিদে আগত মুসল্লিদের অনেকেই বলেন, তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে ইবাদতে অংশ নিয়েছেন। তাদের আশা, আল্লাহ যেন তাদের পরিবারকে নিরাপদ রাখেন, বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করেন এবং দেশবাসীকে শান্তি ও কল্যাণ দান করেন।
এদিকে শবে বরাত উপলক্ষে অনেক বাড়িতেই তৈরি করা হয় হালুয়া ও বিভিন্ন সুস্বাদু খাবার। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী এবং দরিদ্র মানুষের মধ্যে এসব খাবার বিতরণ করার মাধ্যমে অনেকে আনন্দ ও সহমর্মিতার বার্তা ছড়িয়ে দেন।
ধর্মীয় ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আরবি শাবান মাসের ১৫ তারিখ অর্থাৎ ১৪ তারিখ দিবাগত রাত মুসলমানদের কাছে সৌভাগ্যের রাত হিসেবে পরিচিত। ফারসি শব্দ শব অর্থ রাত এবং বরাত অর্থ মুক্তি। ফলে শবে বরাতের অর্থ দাঁড়ায় মুক্তির রাত। এই রাতে বান্দাদের জন্য অশেষ রহমতের দরজা খুলে দেন মহান আল্লাহ, এমন বিশ্বাস থেকেই মুসলমানরা এ রাতকে ইবাদত, দোয়া ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে পালন করে থাকেন।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, শবে বরাতের এই পবিত্র রাত মানুষের হৃদয়ে ক্ষমা, শান্তি ও আত্মশুদ্ধির বার্তা জাগিয়ে তোলে, আর সেই আশাতেই হাজারো মানুষ আল্লাহর দরবারে মাথা নত করে নতুন ভোরের অপেক্ষায় থাকেন।