তুরস্কের কৃষিভূমিতে বাড়ছে রহস্যময় গভীর গর্ত, শঙ্কায় খাদ্য নিরাপত্তা
তুরস্কের শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত কোনিয়া অঞ্চলে একের পর এক গভীর সিঙ্কহোল সৃষ্টি হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয় প্রশাসন ও বিশেষজ্ঞ মহলে। শনিবার ৫ জুলাই প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য ও গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশটির কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার তথ্যমতে, কোনিয়া অববাহিকায় এখন পর্যন্ত ৬৮৪টি সিঙ্কহোল শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় গর্তটির ব্যাস ২২৮ মিটার এবং গভীরতা ১৭১ মিটার বলে জানা গেছে।
স্থানীয় কৃষক মেহমেত আকিফ ইশিকলি জানান, প্রায় দুই দশক আগে তার কৃষিজমির মাঝখানে প্রথম বড় গর্তের সৃষ্টি হয়। পরে আশপাশের জমিতেও একই ধরনের ধস দেখা দেয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মাটি ধসে পড়ার সময় ভেতর থেকে পানির বুদবুদের মতো প্রবাহ বের হতে দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনিয়া একটি বন্ধ অববাহিকা হওয়ায় এখানকার নদী ও ভূগর্ভস্থ পানি সমুদ্রে পৌঁছায় না। এই পানি দীর্ঘদিন ধরে এলাকার কৃষিকাজ, জলাভূমি ও হ্রদের প্রধান উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। এতে মাটির নিচের চুনাপাথরের স্তর দুর্বল হয়ে ধসের ঘটনা বাড়ছে।
জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে তুরস্ক পানি সংকটাপন্ন দেশে পরিণত হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দীর্ঘস্থায়ী খরা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্ব বন্যপ্রাণী তহবিলের তুরস্ক শাখার তথ্য অনুযায়ী, কোনিয়া অঞ্চলে প্রায় এক লাখ নলকূপ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬৬ হাজার নলকূপ অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া ২০১৪ সালেই এ অঞ্চলে পানির ব্যবহার প্রাপ্যতার তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষকরা ফসল রক্ষায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। কিন্তু পর্যাপ্ত পুনঃপূরণ না হওয়ায় ভবিষ্যতের পানির মজুত দ্রুত কমে যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মাটির স্থিতিশীলতার ওপর এবং বাড়ছে সিঙ্কহোলের সংখ্যা।
কোনিয়া টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির ভূতত্ত্ব বিভাগের প্রধান ফেতুল্লাহ আরিক বলেন, এসব গর্ত অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এখন পর্যন্ত প্রাণহানির ঘটনা না ঘটলেও ভবিষ্যতে বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি আরও জানান, অনেক কৃষক আতঙ্কে গর্তগুলো মাটি দিয়ে ভরাট করার চেষ্টা করছেন, যা আরও বড় ধসের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সংকট মোকাবিলায় কৃষিনীতি পুনর্বিবেচনা জরুরি। বর্তমানে ভুট্টা ও সুগার বিটের মতো অধিক পানি প্রয়োজন হয় এমন ফসলে ভর্তুকি দেওয়ায় পানির ওপর চাপ বাড়ছে। এর পরিবর্তে কম পানি প্রয়োজন হয় এমন স্থানীয় গম ও আঙুর চাষে উৎসাহ দিলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
এদিকে কোনিয়া টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির গবেষকরা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্তে বিশেষ মানচিত্র তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষি ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পরিবর্তন না আনলে আগামী বছরগুলোতে কোনিয়া অঞ্চলের কৃষি ও জনজীবনে আরও বড় সংকট দেখা দিতে পারে।