সাত মাসে রাজস্ব ঘাটতি ছাড়াল ৬০ হাজার কোটি টাকা
চলতি ২০২৫ থেকে ২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে জাতীয় রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। জুলাই থেকে জানুয়ারি সময়ে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ ৬০ হাজার কোটির বেশি হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআর সূত্র।
মঙ্গলবার ২৪ ফেব্রুয়ারি সংশ্লিষ্ট তথ্য পর্যালোচনায় জানা যায়, আলোচ্য সময়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই লাখ ৮৩ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা। কিন্তু তিনটি প্রধান খাতে মিলিয়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার ১১৩ কোটি টাকা। সবচেয়ে বড় ঘাটতি হয়েছে আয়কর খাতে।
এ সময়ে আয়কর আদায়ের লক্ষ্য ছিল এক লাখ তিন হাজার ৯৮০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৭৫ হাজার ৫৫ কোটি টাকা। ফলে আয়কর খাতে ঘাটতি হয়েছে ২৮ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা। করপোরেট কর, অগ্রিম আয়কর ও উৎস কর থেকে প্রত্যাশিত রাজস্ব না আসায় এ খাতে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আমদানি পর্যায়ে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭৮ হাজার ৪৯৬ কোটি টাকা। কিন্তু আদায় হয়েছে ৬২ হাজার ৮১৪ কোটি টাকা। ফলে এ খাতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা। ব্যবসা বাণিজ্যে মন্দাভাব, শিল্পে কাঁচামাল আমদানি কমে যাওয়া এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে শুল্ক আদায় প্রত্যাশিত হয়নি বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
ভ্যাট খাতেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। এ সময়ে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্য ছিল এক লাখ এক হাজার ২৭৫ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ৮৫ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা। এতে ঘাটতি হয়েছে ১৫ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আয় সংকোচন এবং ভোগ ব্যয় কমে যাওয়ার প্রভাব ভ্যাট আদায়ে পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সরকার পরিবর্তনের আগে থেকেই অর্থনীতিতে দুর্বলতা ছিল বলে সংশ্লিষ্ট মহল উল্লেখ করছে। ব্যবসা বাণিজ্যে স্থবিরতা, পুঁজিবাজারে আস্থার সংকট, ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা এবং উচ্চ সুদের হার সামগ্রিক পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ায় ভোক্তা ব্যয়ও কমেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আয়ে।
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, ব্যবসার পরিধি ও টার্নওভার না বাড়লে রাজস্বও বাড়বে না। আইন শৃঙ্খলা, করনীতি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি বিনিয়োগে বড় ভূমিকা রাখে। পরিবেশ অনুকূল না হলে বড় বিনিয়োগ আসবে না।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এর আগে নভেম্বর ও ডিসেম্বরেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি ছিল। বাসাভাড়া, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় বৃদ্ধির চাপ সাধারণ মানুষের আয়কে সংকুচিত করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচ্চ সুদের হার নীতি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত ফল এখনো দেয়নি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব ঘাটতির এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বাজেট বাস্তবায়ন ও উন্নয়ন ব্যয়ে চাপ বাড়তে পারে। তাই বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, ব্যবসায়িক আস্থা পুনরুদ্ধার এবং কর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।
রাষ্ট্রের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড টিকিয়ে রাখতে শক্তিশালী রাজস্ব ভিত্তি অপরিহার্য। অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর নীতি ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপই পারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং কোষাগারে প্রাণসঞ্চার করতে।