থাইল্যান্ডে নতুন সরকার গঠনে ভোট, রাজনীতি ঘিরে অনিশ্চয়তা
দুই বছরে তিনবার প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের পর আবারও নতুন সরকার গঠনের লক্ষ্যে ভোট দিচ্ছেন থাইল্যান্ডের জনগণ। রোববার অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে মুখোমুখি হয়েছে সংস্কারপন্থি পিপলস পার্টি এবং ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল জোট। রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিচারিক হস্তক্ষেপ ও সামরিক প্রভাবের কারণে নির্বাচন ঘিরে দেশজুড়ে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।
ব্যাংকক থেকে এএফপি জানায়, নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকারকে একাধিক জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে কম্বোডিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ, যা গত বছর দুই দফা প্রাণঘাতী সংঘর্ষে রূপ নেয়। পাশাপাশি দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াজুড়ে সক্রিয় বহুজাতিক সাইবার প্রতারণা চক্র দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াও নতুন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও থাইল্যান্ড চাপের মধ্যে রয়েছে। প্রবৃদ্ধি দুর্বল, পর্যটন খাত এখনো পুরোপুরি কোভিড পূর্ব অবস্থায় ফিরতে পারেনি। একই সময়ে ভিয়েতনাম দ্রুত বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় থাইল্যান্ডকে পেছনে ফেলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনেও কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। ফলে তিন বছরেরও কম সময় আগে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত নির্বাচনের মতো পরিস্থিতি আবারও তৈরি হতে পারে। সেই নির্বাচনে প্রগতিশীল পিপলস পার্টির পূর্বসূরি দল সর্বাধিক ভোট পেলেও প্রধানমন্ত্রী গঠনের সুযোগ পায়নি এবং পরে দলটি বিলুপ্ত করা হয়।
পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন শিনাওয়াত্রার দল ফেউ থাই পার্টি তৃতীয় স্থান পাওয়া রক্ষণশীল ভুমজাইথাই পার্টির সঙ্গে জোট গড়ে সরকার গঠন করে। তবে আদালতের রায়ে প্রথমে প্রধানমন্ত্রী অপসারিত হন, পরে থাকসিনের কন্যা পেতংতার্ন শিনাওয়াত্রাকেও ক্ষমতা ছাড়তে হয়। সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বরে সংসদ আনুতিন চার্নভিরাকুলকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করে, যিনি দুই বছরে থাইল্যান্ডের তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী।
রাজনীতি বিশ্লেষক নাপোন জাতুসরিপিতাক মনে করেন, থাইল্যান্ডে এখন নির্বাচনের ফল ও সরকার গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্যে স্পষ্ট বিচ্ছেদ তৈরি হয়েছে। তার মতে, সামরিক অভ্যুত্থান, আদালতের হস্তক্ষেপ এবং অনির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের প্রভাব নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষমতা ক্রমশ দুর্বল করে দিচ্ছে, যা গণতন্ত্রের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছে পিপলস পার্টি, যারা প্রায় এক তৃতীয়াংশ ভোট পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে আনুতিনের ভুমজাইথাই পার্টি। ক্যানাবিস বৈধকরণের পক্ষে অবস্থান নেওয়া এই দলটি আবারও ফেউ থাইয়ের সঙ্গে জোট গড়ে ক্ষমতায় থাকতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
একসময় অত্যন্ত জনপ্রিয় ফেউ থাই পার্টির সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কম্বোডিয়া ইস্যুতে সাংবিধানিক আদালতের রায়ে পেতংতার্নের অপসারণ এবং থাকসিনের দুর্নীতির সাজা দলটির ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। জরিপ অনুযায়ী, দলটি এবার প্রায় ১৬ শতাংশ ভোট পেতে পারে।
ভুমজাইথাই পার্টি জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, বিশেষ করে সীমান্ত উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে। অন্যদিকে পিপলস পার্টি বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ বাতিল এবং জেনারেলের সংখ্যা কমানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।
এই নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে একটি গণভোটও অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে ভোটাররা সংবিধান সংস্কারের প্রয়োজন আছে কি না সে বিষয়ে মত দিচ্ছেন, যদিও নির্দিষ্ট কোনো সংস্কার প্রস্তাব এতে অন্তর্ভুক্ত নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, পুরোনো ক্ষমতাকাঠামো অটুট থাকলে এই নির্বাচনের মাধ্যমে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন আসা কঠিন হবে। তবু ভোটের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের আশা ও আকাঙ্ক্ষা আবারও উচ্চারিত হচ্ছে, যা থাইল্যান্ডের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য নীরব কিন্তু গভীর এক প্রত্যাশার বার্তা বহন করছে।