তফসিল ঘোষণার পর ৩৬ দিনে রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৫ জন নিহত, উদ্বেগ প্রকাশ টিআইবির
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরের ৩৬ দিনে সারাদেশে অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। সংস্থাটি বলছে, নির্বাচনের আগমুহূর্তে রাজনৈতিক সহিংসতা বাড়ার এই প্রবণতা ভোটের পরিবেশকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে।
টিআইবি ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে দেশে মোট ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১০২ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে নিখোঁজ হয়েছে ১ হাজার ৩৩৩টি আগ্নেয়াস্ত্র, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
টিআইবি জানিয়েছে, থানা থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র এখনো উদ্ধার না হওয়া এবং নতুন করে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ায় সহিংসতার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। সংস্থাটির মতে, এই পরিস্থিতিতে অস্ত্রের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে সহিংসতা আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, সরকার যদি মব সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তিনি মনে করেন, নির্বাচনের সময় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।
কর্তৃত্ববাদ পতন পরবর্তী দেড় বছর প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে টিআইবি আরও বলেছে, বর্তমান নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় সহিংসতা, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের হেনস্তা, সম্ভাব্য প্রার্থীদের ওপর হামলা এবং সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মতো একাধিক ঘাটতি স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এ সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর ৫০টিরও বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে।
প্রতিবেদনে জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কার্যক্রম নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। টিআইবি অভিযোগ করেছে, এই বিচার প্রক্রিয়ায় ক্ষেত্রবিশেষে আইনি প্রক্রিয়া লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে পুরনো ধারা বহাল আছে এবং অযৌক্তিক মামলা দায়ের, বিনা বিচারে আটক, জামিনযোগ্য মামলায় দীর্ঘদিন জামিন না দেওয়া এবং সরকারি প্রভাবের অভিযোগ উঠে এসেছে। এমনকি সাংবাদিক ও পেশাজীবীদের হত্যার মামলায় আসামি করার ঘটনাও ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা নিয়েও বিশেষভাবে উদ্বেগ জানিয়েছে টিআইবি। সংস্থাটি বলেছে, গণপিটুনিতে মৃত্যুর ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে এবং মব তৈরি করে দাবি আদায়ের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বলপূর্বক দাবি আদায়ে সফলতার ঘটনাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।
টিআইবির মতে, এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কৌশল বা কার্যকর পদক্ষেপের অভাব রয়েছে। সংস্থাটি বলছে, নিষ্ক্রিয়তা এবং ক্ষেত্রবিশেষে তোষণমূলক অবস্থানের কারণে অতি ক্ষমতায়নের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কারা হেফাজতে ও সেনাবাহিনীর হেফাজতে বিচারবহির্ভূত হত্যা, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা, ঢালাও মামলায় আসামি করা এবং গ্রেপ্তার বাণিজ্যের মতো নানা ঘাটতির বিষয়ও উদ্বেগজনক।
সবশেষে বলা যায়, নির্বাচন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ হলেও সহিংসতার ছায়া সেই অধিকারকে দুর্বল করে দেয়, আর শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়তে হলে আইন, ন্যায়বিচার ও মানবিকতার জায়গাটিই হতে হবে সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি।