হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা, কেন গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান উত্তেজনার মধ্যে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। বিশ্ব তেল বাণিজ্যের একটি বড় অংশ যে জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, সেই হরমুজ প্রণালীতে রবিবার থেকে সরাসরি গোলাবর্ষণসহ নৌ মহড়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। এতে বিশ্ব জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজের তথ্য অনুযায়ী, ইরান ও ওমানকে পৃথক করা এই সরু সামুদ্রিক পথটি বর্তমানে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। হরমুজ প্রণালীর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশ মাত্র ৩৩ কিলোমিটার চওড়া হলেও এর মাধ্যমেই আরব উপসাগর যুক্ত হয়েছে ওমান উপসাগর ও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে। ফলে সামান্য সময়ের জন্যও এই পথে বিঘ্ন ঘটলে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিদিন বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেল বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী দিয়ে যায়। একইসঙ্গে কাতারসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানিতেও এই রুট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিপিং লেনগুলো প্রতিটি দিকেই মাত্র কয়েক কিলোমিটার চওড়া হলেও প্রণালীটি এতটাই গভীর যে বড় তেলবাহী জাহাজ চলাচল করতে পারে। উপসাগরীয় অঞ্চলের অনেক দেশের তেল রপ্তানির বিকল্প পথ সীমিত থাকায় এই রুটে সামান্য বিঘ্নও জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ১ ফেব্রুয়ারি থেকে হরমুজ প্রণালীতে দুই দিনের নৌ মহড়া পরিচালনা করা হবে, যেখানে সরাসরি গোলাবর্ষণও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানকে সতর্ক করেছে। তারা বলেছে, মহড়াটি যেন নিরাপদ ও পেশাদারভাবে পরিচালিত হয় এবং এমন কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া হয় যাতে বাণিজ্যিক জাহাজ বা যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র দেশগুলোর নৌবাহিনী ঝুঁকিতে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালী যদি সাময়িক সময়ের জন্যও বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং পরিবহন, খাদ্যপণ্যসহ সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে চাপ তৈরি হবে। এশিয়া ও ইউরোপের জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো তাৎক্ষণিকভাবে সংকটে পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, তেলবাহী জাহাজগুলো বিকল্প পথে ঘুরে যেতে বাধ্য হলে পরিবহন বিলম্বিত হবে এবং ভাড়া বেড়ে যাবে। একইসঙ্গে বিমা ব্যয় বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের খরচও বৃদ্ধি পেতে পারে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের অস্থিরতা শেয়ারবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে জ্বালানি-নির্ভর খাতে।
পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে বড় অর্থনীতির দেশগুলো তাদের কৌশলগত তেল মজুত ব্যবহার করতে পারে। তবে সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যার বড় চাপ পড়তে পারে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর।
এর আগেও হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার নজির রয়েছে। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় উপসাগরে তেলবাহী জাহাজে হামলা চালানো হয়, যা ইতিহাসে ‘ট্যাংকার যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। এছাড়া ২০১১-১২ সালেও ইরান একাধিকবার প্রণালী বন্ধের হুমকি দিলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। তবে সেই হুমকির প্রভাবেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে গিয়েছিল।