ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমে নতুন কাঠামো, অন্তর্বর্তী সরকারের মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ জারি
দেশের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমকে আরও সুসংহত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন এবং ঋণগ্রহীতাদের মালিকানা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকার ‘মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করেছে। নতুন এই অধ্যাদেশের ফলে এখন থেকে ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতারা শুধু গ্রাহক নয়, বরং ব্যাংকের মালিকানায় অংশীদারিত্বও পাবেন।
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার ২৯ জানুয়ারি আইন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম এ তথ্য জানান।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ৫০০ কোটি টাকা অনুমোদিত মূলধনে ‘মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক’ গঠিত হবে, যার অন্তত ৬০ শতাংশ মালিকানা থাকবে সাধারণ ঋণগ্রহীতাদের হাতে। একইসঙ্গে ব্যাংকটিকে একটি সামাজিক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে, যেখানে ব্যক্তিগত লভ্যাংশের পরিবর্তে অর্জিত মুনাফা পুনরায় সামাজিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচন খাতে ব্যয় করতে হবে।
ব্যাংক প্রতিষ্ঠা ও মূলধন কাঠামো
অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে লাইসেন্স নিয়ে নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার জন্য এ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা যাবে। ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন হবে ৫০০ কোটি টাকা এবং প্রারম্ভিক পরিশোধিত মূলধন হবে কমপক্ষে ২০০ কোটি টাকা। এই ব্যাংকের অন্তত ৬০ শতাংশ মূলধন আসবে ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডারদের কাছ থেকে। তবে কোনো মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হতে পারবে না।
পরিচালনা পর্ষদের কাঠামো
অধ্যাদেশ অনুযায়ী ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ড হবে ৯ সদস্যের। এর মধ্যে ৪ জন পরিচালক ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডারদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হবেন। এছাড়া ৩ জন মনোনীত পরিচালক, ২ জন স্বতন্ত্র পরিচালক এবং ভোটাধিকারবিহীন একজন পদাধিকারবলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকবেন। কোনো পরিচালক টানা দুই মেয়াদের বেশি দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
সামাজিক ব্যবসায় ও মুনাফা নীতি
অধ্যাদেশে ব্যাংকটিকে সামাজিক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিনিয়োগকারীরা তাদের মূল বিনিয়োগের অতিরিক্ত অর্থ লভ্যাংশ হিসেবে পাবেন না। তবে সাধারণ ঋণগ্রহীতা শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষেত্রে এই বিধান শিথিল করার সুযোগ রাখা হয়েছে। অবশিষ্ট নীট মুনাফা সামাজিক খাতে ব্যবহারের বিধান রাখা হয়েছে।
ব্যাংকের কার্যক্রম ও ঋণ আদায়
অধ্যাদেশে ব্যাংকের প্রধান কার্যাবলীর মধ্যে রয়েছে নতুন উদ্যোক্তাদের আত্ম-কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচনে ঋণ দেওয়া, আমানত গ্রহণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসায় বিনিয়োগের জন্য উদ্যোগ মূলধন প্রদান, বিনা ফিতে কারিগরি ও প্রশাসনিক সহায়তা এবং শিল্প ও কৃষিজাত পণ্য, গবাদিপশু ও যন্ত্রপাতির জন্য ঋণ সহায়তা দেওয়া।
ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে ব্যাংক অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ অনুসরণ করতে পারবে। তবে ঋণ আদায়ের সময় সামাজিক সংবেদনশীলতা বজায় রাখা এবং কোনো ধরনের জবরদস্তি বা অবমাননাকর পদ্ধতি ব্যবহার না করার নির্দেশনা রাখা হয়েছে।
নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তবায়ন
অধ্যাদেশ অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক এই ব্যাংকের লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করবে এবং প্রয়োজনে পরিচালনা বোর্ড বাতিল বা চেয়ারম্যান ও পরিচালককে অপসারণের ক্ষমতা রাখবে। এছাড়া ব্যাংকের কার্যক্রম ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১ এবং মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি আইন, ২০০৬ এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হবে।
অধ্যাদেশটি কার্যকর হওয়ার তারিখ সরকার প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নির্ধারণ করবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সূত্র: Zoom Bangla News