ব্রিটেনে আন্দোলন দমনে কঠোরতা, বাড়ছে নতুন ধরনের রাজনৈতিক বন্দীর অভিযোগ
জলবায়ু সংকট ও গাজা যুদ্ধ ইস্যুকে কেন্দ্র করে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্রিটেনে কঠোর অবস্থান নতুন ধরনের রাজনৈতিক বন্দী তৈরির পথ খুলে দিচ্ছে বলে দাবি উঠেছে একটি নতুন গবেষণা প্রতিবেদনে। গবেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড ও কড়াকড়ি নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে।
মঙ্গলবার ২৭ মে, প্রকাশিতব্য এক যৌথ গবেষণায় কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন এবং আন্দোলনকারী সংগঠন ডিফেন্ড আওয়ার জুরিস জানায়, অতীতে প্রত্যক্ষ আন্দোলন কিংবা আইন অমান্যের ঘটনায় কারাদণ্ড তুলনামূলক বিরল হলেও বর্তমানে একই ধরনের কর্মকাণ্ডে নিয়মিত দীর্ঘ সাজা দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে বিক্ষোভবিরোধী আইন সম্প্রসারণ, পুলিশের বাড়তি ক্ষমতা, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দেওয়া দেওয়ানি নিষেধাজ্ঞা এবং আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের সীমিত সুযোগ আন্দোলনকারীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
গবেষণায় জলবায়ু ও ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ২৮৬টি কারাবন্দিত্বের ঘটনা চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় মোট ১৩৬ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
যেসব ২৫৬টি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া গেছে, সেগুলোর বিশ্লেষণে দেখা যায়, গড় কারাদণ্ড ছিল ২৮ সপ্তাহ। প্রতি তিনজনের একজনকে অন্তত ছয় মাস এবং প্রতি পাঁচজনের একজনকে এক বছরের বেশি সময় কারাভোগ করতে হয়েছে।
গবেষণার সহলেখক ও কিউএমইউএলের জলবায়ু ন্যায়বিচারবিষয়ক অধ্যাপক ডেভিড হোয়াইট বলেন, রাজনৈতিক প্রতিবাদের ক্ষেত্রেই ব্যতিক্রমধর্মী শাস্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ রিমান্ড ও কঠোর সাজা ব্যবহার করে এমন এক শ্রেণির বন্দী তৈরি করা হচ্ছে, যারা মূলত রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও অসহযোগমূলক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত।
প্রতিবেদনে রিমান্ডকে আন্দোলন দমনের প্রাথমিক কৌশল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকদের দাবি, প্রায় ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রে বিচারের আগে হেফাজতে কাটানো সময় পরবর্তী সাজাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে ফিলটন ২৪ নামে পরিচিত একটি মামলা। ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠন প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের সদস্যরা ব্রিস্টলের কাছে ইসরাইলি অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এলবিট সিস্টেমস সংশ্লিষ্ট একটি কারখানায় বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার পর অভিযুক্ত হন। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে বিচারের আগেই দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকতে হয়েছে। পরে প্রথম ছয় আসামির কয়েকজন গুরুতর চুরি ও সম্পত্তি ক্ষতির অভিযোগ থেকে খালাস পান।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, জুরি বিচার ছাড়াই দেওয়া কারাদণ্ডের বড় অংশ আদালত অবমাননার অভিযোগে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিচারকের নির্দেশ অমান্য কিংবা সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার জারি করা নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গের অভিযোগে এসব সাজা দেওয়া হয়।
অধ্যাপক হোয়াইট বলেন, সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দেওয়ানি নিষেধাজ্ঞা ধীরে ধীরে ফৌজদারি অপরাধে রূপ নিচ্ছে। এর ফলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও এমন প্রভাব বিস্তার করতে পারছে, যা শেষ পর্যন্ত মানুষের কারাবাসের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
প্রতিবেদনে ২০২২ সালে জাস্ট স্টপ অয়েল আন্দোলনের পর নেওয়া পদক্ষেপের উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, ওয়ারউইকশায়ার বরো কাউন্সিল হাইকোর্টের মাধ্যমে একটি নিষেধাজ্ঞা জারি করার পর ৬৯ জন আন্দোলনকারীকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাদের কয়েকজন শুধুমাত্র প্ল্যাকার্ড বহনের কারণেও দণ্ডিত হন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে ব্রিটিশ বিচার বিভাগ। এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, বিচারিক স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা আইনের শাসনের মূলভিত্তি। বিচারকরা প্রমাণ, আইন ও স্বাধীন দণ্ডবিধি পরিষদের নির্দেশনা অনুসারেই সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকেন।