ইরান যুদ্ধের প্রভাবে আরও ঘনিষ্ঠ আমিরাত ও ইসরাইল, গঠন হলো যৌথ প্রতিরক্ষা তহবিল
চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনা ও ইরানকে ঘিরে নিরাপত্তা শঙ্কার মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরাইল যৌথভাবে একটি বিশেষ প্রতিরক্ষা তহবিল গঠন করেছে। দুই দেশের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও অস্ত্র ব্যবস্থা যৌথভাবে ক্রয়ের লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
রোববার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই, বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এ তথ্য প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন এই অংশীদারত্বের আওতায় দুই দেশ যৌথভাবে সমরাস্ত্র ক্রয় করবে এবং বিশেষ করে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে বড় পরিসরে বিনিয়োগ করা হতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ইসরাইলের বিমান প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির উন্নয়নেও সংযুক্ত আরব আমিরাত অর্থায়ন করতে পারে। মূলত ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়নে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করবে।
সূত্রগুলোর দাবি, মার্কিন ইসরাইল ও ইরান সংঘাত চলাকালে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর আমিরাত সফরের সময় এই সমঝোতা চূড়ান্ত হয়। যদিও নেতানিয়াহুর কার্যালয় সফরের বিষয়ে বিবৃতি দিলেও আবুধাবি আনুষ্ঠানিকভাবে তা অস্বীকার করেছিল।
ওয়াশিংটনে নিযুক্ত আমিরাত ও ইসরাইলি দূতাবাস এ বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি ঘনিষ্ঠ।
তেল আবিবভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক ইয়োয়েল গুজান্সকি বলেন, কোনো আরব দেশের সঙ্গে ইসরাইলের এত ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সহযোগিতা অতীতে দেখা যায়নি। তার মতে, দুই দেশের সম্পর্ক বর্তমানে ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন ইসরাইলি হামলার জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে বিপুল সংখ্যক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত। প্রতিবেদনে বলা হয়, আমিরাতকে লক্ষ্য করে প্রায় তিন হাজার ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া হয়েছিল।
সংঘাতের সময় ইসরাইল তাদের আয়রন ডোম প্রতিরক্ষা ব্যাটারি এবং সংশ্লিষ্ট সেনা সদস্য আমিরাতে মোতায়েন করেছিল বলেও জানা গেছে। চলতি মে মাসে ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
গুজান্সকির ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরাইলের কাছে উন্নত প্রযুক্তি থাকলেও আর্থিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিপরীতে আমিরাতের অর্থনৈতিক সক্ষমতা শক্তিশালী হলেও উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে তাদের নির্ভরতা রয়েছে বিদেশি অংশীদারদের ওপর। তাই যৌথ তহবিল গঠন দুই দেশের জন্যই বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইল ধীরে ধীরে মার্কিন সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমানোর পথও খুঁজছে। প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক বার্নার্ড হাইকেল বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে ইসরাইলের প্রতি সমর্থন কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতের অর্থায়ন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদার খোঁজা ইসরাইলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপুল অর্থনৈতিক সক্ষমতা রয়েছে। ফলে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা খাতে ইসরাইলের জন্য আবুধাবি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত হতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইরান ইস্যুতে উপসাগরীয় দেশগুলোর অবস্থানে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। সৌদি আরব যেখানে পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিসরের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা জোরদার করছে, সেখানে আমিরাত ভিন্ন কৌশল নিয়ে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করছে।
ইউরেশিয়া গ্রুপের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিভাগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফিরাস মাকসাদ বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে আমিরাতের সবচেয়ে বড় কৌশলগত শক্তি এখন ইসরাইলের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক। তার মতে, তেহরানের সঙ্গে উত্তেজনা যত বাড়বে, আবুধাবি তত বেশি ইসরাইলের দিকে ঝুঁকবে।