মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে ওমরাহ যাত্রীদের দুর্ভোগ, হাজারো মুসল্লি আটকে সৌদি আরবে
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় সৌদি আরবে ওমরাহ পালন করতে যাওয়া হাজার হাজার মুসল্লি চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে অনেক যাত্রী নিজ দেশে ফেরার অনিশ্চয়তায় উদ্বেগের মধ্যে সময় পার করছেন। অনেকে বিকল্প পথে ফেরার চেষ্টা করছেন, আবার অনেকেই অনিশ্চিত পরিস্থিতির কারণে পূর্বনির্ধারিত ওমরাহ যাত্রা স্থগিত বা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছেন।
সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার নাগরিকরা। ইন্দোনেশিয়ার হজ ও ওমরাহ বিষয়ক উপমন্ত্রী দাহনিল আনজার সিমানজুন্তাক জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রায় ৫৮ হাজার ৮৬০ জন ইন্দোনেশীয় নাগরিক সৌদি আরবে অবস্থান করছেন এবং তাদের অনেকেই ফেরার অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। বিপুল সংখ্যক যাত্রী দীর্ঘদিন হোটেলে অবস্থান করায় আবাসন ও অতিরিক্ত খরচ নিয়ে বড় ধরনের সংকটে পড়েছেন।
ইন্দোনেশিয়া সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় সৌদি কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। আটকে পড়া যাত্রীদের হোটেল ভাড়া ও অতিরিক্ত টিকিটের খরচ কমানোর বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে আরও প্রায় ৬০ হাজার নাগরিককে এপ্রিল মাস পর্যন্ত ওমরাহ যাত্রা পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে দেশটি। সরকার এই পরিস্থিতিকে মানবিক ও লজিস্টিক সংকট হিসেবে দেখছে।
অন্যদিকে মালয়েশিয়ার জেদ্দায় নিযুক্ত কনসাল জেনারেল মোহাম্মদ জারাইফ রাজা আব্দুল কাদির জানিয়েছেন, প্রায় ১ হাজার ৬০০ মালয়েশীয় ওমরাহ যাত্রী বর্তমানে সৌদি আরবে আটকা পড়েছেন। তাদের সহায়তায় জেদ্দায় ২৪ ঘণ্টার একটি অপারেশন রুম চালু করা হয়েছে। মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্স জেদ্দা ও মদিনা থেকে বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনার মাধ্যমে নাগরিকদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। তবে আঞ্চলিক পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় এই প্রক্রিয়া জটিল হয়ে উঠেছে।
আটকে পড়া অনেক হাজি জানিয়েছেন, পবিত্র স্থানগুলোতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও নিজ দেশে ফেরার বিষয়টি নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। প্রতিদিন ফ্লাইটের নতুন তথ্য খোঁজা এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এখন তাদের নিয়মিত কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ার এক হাজি জানিরাহ ফারিস জানান, তার নির্ধারিত ফিরতি ফ্লাইট বাতিল হয়ে ১২ মার্চ পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত খরচে হোটেলে থাকা অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয় বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দা জাভেদ খিজার পরিবারসহ ওমরাহ পালনের পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু তুরস্ক ও কাতার হয়ে ভ্রমণের ঝুঁকি থাকায় শেষ মুহূর্তে তিনি সফর বাতিল করেন। তিনি জানান, বর্তমান পরিস্থিতি দেখে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন এবং রমজান মাসে ওমরাহ পালনের সুযোগ হাতছাড়া হওয়ায় তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বব্যাপী বিমান যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এ অঞ্চলে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার মধ্যে আকাশপথে যাতায়াত ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে শুধু যাত্রী পরিবহন নয়, ধর্মীয় সফরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের মাধ্যমে সংকট নিরসনের আশায় দিন গুনছেন হাজারো ওমরাহ যাত্রী। কারণ পবিত্র ইবাদতের পথে অনিশ্চয়তা যত দীর্ঘ হয়, ততই বাড়ে মানুষের কষ্ট, উদ্বেগ এবং প্রার্থনা।