হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনার মধ্যেও বাংলাদেশের স্বস্তি, চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাচ্ছে জ্বালানি ও কাঁচামালবাহী জাহাজ
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে সৃষ্ট যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যখন বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তখন বাংলাদেশের জন্য এসেছে কিছুটা স্বস্তির খবর। সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কার মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করা বেশ কয়েকটি পণ্যবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে শুরু করেছে।
শনিবার ৭ মার্চ বন্দর সূত্রে জানা গেছে, হরমুজ প্রণালি পার হয়ে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া মোট ১৫টি পণ্যবাহী জাহাজের মধ্যে ১২টি ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছেছে। বাকি তিনটি জাহাজও চলতি সপ্তাহের মধ্যেই বন্দরে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এসব জাহাজে প্রায় সাড়ে সাত লাখ টন জ্বালানি তেল, গ্যাস এবং শিল্পকারখানার গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল রয়েছে। এর মধ্যে চারটি জাহাজে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এলএনজি, দুটি জাহাজে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস এলপিজি এবং নয়টি জাহাজে সিমেন্ট শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ক্লিংকারসহ বিভিন্ন উপকরণ বহন করা হচ্ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা তীব্র হয়ে ওঠে। পাল্টা প্রতিক্রিয়া ও হুঁশিয়ারির পরিপ্রেক্ষিতে হরমুজ প্রণালি ঘিরে আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ দেখা দেয়। কারণ বিশ্বের মোট তেল ও এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে প্রণালিতে যেকোনো ধরনের বিঘ্ন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এই প্রণালির গুরুত্বও অত্যন্ত বেশি। ইরাক, ইরান, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় সাতটি দেশের সঙ্গে পণ্য আমদানি রপ্তানির ক্ষেত্রে এই নৌপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে জানা গেছে, কাতারের রাস লাফান বন্দর থেকে ১ লাখ ২৬ হাজার টন এলএনজি নিয়ে আল জোর ও আল জাসাসিয়া নামের দুটি জাহাজ ইতোমধ্যে বন্দরে এসে পৌঁছেছে। এছাড়া লুসাইল এবং আল গালায়েল নামের আরও দুটি এলএনজি জাহাজ আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বন্দরের জলসীমায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সব মিলিয়ে এই চারটি জাহাজে প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার টন এলএনজি রয়েছে।
এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজগুলোর স্থানীয় প্রতিনিধি ইউনি গ্লোবাল বিজনেস লিমিটেডের জ্যেষ্ঠ উপমহাব্যবস্থাপক মো. নুরুল আলম জানান, চারটি এলএনজি জাহাজ নিরাপদে চট্টগ্রামে পৌঁছানোর ব্যাপারে তারা অনেকটাই নিশ্চিত। তবে লিব্রেথা নামের আরেকটি এলএনজিবাহী জাহাজ এখনও হরমুজ প্রণালির ভেতরে অবস্থান করছে এবং এটি পার হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে পরবর্তী চালান নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার আন্তর্জাতিক খোলাবাজার থেকেও তুলনামূলক বেশি দামে দুটি এলএনজি জাহাজ ক্রয় করেছে, যদিও সেগুলো এখনো চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়নি।
এদিকে এলপিজি সরবরাহের ক্ষেত্রেও কিছুটা স্বস্তির খবর রয়েছে। ওমানের সোহার বন্দর থেকে ২২ হাজার ১৭২ টন এলপিজি নিয়ে সেভান নামের একটি জাহাজ শনিবার বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এর আগে একই বন্দর থেকে জি ওয়াইএমএম নামের আরেকটি জাহাজ ১৯ হাজার ৩১৬ টন এলপিজি নিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগেই বন্দরে এসে পৌঁছেছিল। এই দুটি জাহাজে মোট প্রায় ৩৫ হাজার টন এলপিজি এসেছে, যা মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মেঘনা ফ্রেশ এলপিজির জন্য আনা হয়েছে।
এছাড়া কুয়েতের শুয়াইবা বন্দর থেকে ৫ হাজার টন মনোইথিলিন গ্লাইকোল নিয়ে বে ইয়াসু নামের একটি জাহাজ গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে সিমেন্ট শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ক্লিংকার, জিপসাম, চুনাপাথর ও পাথরসহ প্রায় ৫ লাখ ১৫ হাজার টন কাঁচামাল বহনকারী কয়েকটি জাহাজও বন্দরে এসেছে।
বন্দর ও শুল্ক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৪ থেকে ২০২৫ অর্থবছরে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে বাংলাদেশ প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। এর বড় অংশই জ্বালানি পণ্য।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে নতুন জাহাজ ছাড়ার বিষয়টি অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। ফলে ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে পণ্য পরিবহনে জটিলতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তবু এই সংকটময় সময়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ নিরাপদে বাংলাদেশের বন্দরে পৌঁছানো দেশের জ্বালানি ও শিল্পখাতের জন্য আশাব্যঞ্জক বার্তা বহন করছে। কারণ সমুদ্রপথে ভেসে আসা প্রতিটি জাহাজ শুধু পণ্য নয়, বহন করে একটি দেশের অর্থনীতি সচল রাখার শক্তি, মানুষের জীবনযাত্রার স্বাভাবিকতা এবং আগামীর প্রতি নতুন আশার আলো।