ড্রোন ও সমুদ্র মাইন ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালি অচল করতে পারে ইরান
মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কয়েক মাস পর্যন্ত অচল করে রাখার সক্ষমতা ইরানের রয়েছে বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। বিশেষ করে ড্রোন হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত এবং সমুদ্র মাইন ব্যবহার করে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করা সম্ভব বলে তাদের ধারণা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার জবাবে ইরান ইতোমধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে এক হাজারের বেশি ড্রোন এবং কয়েকশ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। যদিও বেশিরভাগ হামলাই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় প্রতিহত করা হয়েছে, তবুও কিছু অবকাঠামো ও সামরিক স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক হামলার পর বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন এই জলপথ দিয়ে হয়ে থাকে।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তরের অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইনফরমেশন রেজিলিয়েন্সের তথ্য অনুযায়ী, ইরান প্রতি মাসে প্রায় ১০ হাজার ড্রোন উৎপাদনের সক্ষমতা রাখে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে ড্রোন হামলা চালানোর সামর্থ্য দেশটির রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র মজুতের সঠিক সংখ্যা স্পষ্ট না হলেও ইসরাইলি সামরিক সূত্রের অনুমান অনুযায়ী তেহরানের কাছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। অন্য কিছু বিশ্লেষক এই সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার পর্যন্ত হতে পারে বলে মনে করেন। তবে চলমান সংঘাত কতদিন স্থায়ী হবে তা অনেকাংশেই এই অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর নির্ভর করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালি প্রায় অবরুদ্ধ অবস্থায় রেখেছে। ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী এই সরু জলপথ দিয়ে যাতায়াতের চেষ্টা করলে জাহাজে হামলা চালানো হতে পারে বলে সতর্ক করেছে তেহরান। ইতোমধ্যে কয়েকটি জাহাজে হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারেও। অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের বিষয়টি ইরানের জন্য একটি দুর্বল দিক হতে পারে। কারণ ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার পক্ষে ইরানকে বড় ধরনের অস্ত্র সহায়তা দেওয়া কঠিন। একইভাবে চীনও এ ধরনের সামরিক সহায়তায় সতর্ক অবস্থান নিতে পারে।
আরেকটি বিষয় হলো ইরানের কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ইতোমধ্যে লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর কাছে সরবরাহ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ফলে দেশটির নিজস্ব মজুত কিছুটা কমে থাকতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি দেখা দিলেও ড্রোন হামলা চালিয়ে ইরান যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে। ইরানের আধুনিক শাহেদ ১৩৬ ড্রোন প্রায় ৭০০ থেকে ১০০০ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম। এগুলো স্থলভাগ বা জাহাজ থেকেও উৎক্ষেপণ করা যায়।
এছাড়া চরম পরিস্থিতিতে ইরান সমুদ্র মাইন ব্যবহার করতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকরা। সমুদ্রপথ পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ড্রায়াড গ্লোবালের মতে, ইরানের কাছে ৫ থেকে ৬ হাজার সমুদ্র মাইন রয়েছে।
যদি হরমুজ প্রণালিতে মাইন পাতা হয়, তবে সেগুলো অপসারণ করে পথ নিরাপদ করতে কয়েক মাস সময় লেগে যেতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান যদি কয়েকটি ট্যাঙ্কার বা জাহাজে সফল হামলা চালিয়ে এই জলপথকে অনিরাপদ হিসেবে প্রমাণ করতে পারে, তবে আতঙ্কের কারণে অনেক বাণিজ্যিক জাহাজই এই পথে চলাচল বন্ধ করে দিতে পারে। আর তাতেই বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।