ইরান সংকটে কূটনৈতিক সমর্থন দিলেও সামরিক সহায়তায় নীরব রাশিয়া ও চীন
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ইরানে ব্যাপক প্রাণহানির পর দেশটির ঘনিষ্ঠ দুই কূটনৈতিক অংশীদার রাশিয়া ও চীন হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত তেহরানকে সরাসরি সামরিক সহায়তা দেওয়ার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি এই দুই পরাশক্তি।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে লক্ষ্য করে হামলাকে মানবিক ও নৈতিক সব নীতির গুরুতর লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেন। অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সারের সঙ্গে ফোনালাপে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করেন এবং সব পক্ষকে উত্তেজনা না বাড়ানোর আহ্বান জানান।
রাশিয়া ও চীন একসঙ্গে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক আহ্বানের দাবি জানিয়েছে। এ ঘটনাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তিন দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে কৌশলগত সহযোগিতা থাকলেও সেটি সরাসরি সামরিক জোটে পরিণত হয়নি।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে রাশিয়া ও ইরান একটি বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তির আওতায় বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও শিক্ষা খাতে সমন্বয় জোরদারের কথা বলা হয়। একই সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং সামরিক সমন্বয় বৃদ্ধির বিষয়ও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এই চুক্তিতে পারস্পরিক সামরিক প্রতিরক্ষার বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে কোনো দেশ যুদ্ধে জড়ালে অন্য দেশকে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিতে হবে এমন শর্ত সেখানে রাখা হয়নি।
রুশ বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মস্কো নতুন কোনো বড় সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তাই তারা ইরানের পক্ষে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা কম।
চীনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। ২০২১ সালে বেইজিং ও তেহরানের মধ্যে ২৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর আওতায় জ্বালানি, অবকাঠামো ও বিনিয়োগ খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং ইরানকে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। তবে চীন ঐতিহ্যগতভাবে অন্য দেশের সংঘাতে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকার নীতি অনুসরণ করে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীন ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখলেও সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে স্পষ্ট সীমারেখা টেনে রেখেছে। বরং কূটনৈতিক উদ্যোগ, মধ্যস্থতা এবং আন্তর্জাতিক আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমনের দিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বেইজিং।
অর্থনৈতিক বাস্তবতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৮৭ শতাংশ চীনে যায়। ফলে জ্বালানি বাজারে ইরান চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও বৈশ্বিক বাণিজ্যের তুলনায় এটি সীমিত অংশীদারিত্ব।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে তা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই রাশিয়া ও চীন সামরিক জোটের পথে না গিয়ে কূটনৈতিক চাপ, আন্তর্জাতিক আলোচনা এবং মধ্যস্থতার মাধ্যমেই সংকট মোকাবিলার কৌশল বেছে নিয়েছে।