ইরানে হামলা নিয়ে ওয়াশিংটনের যুক্তি নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক অভিযানের ছয় দিন পেরিয়ে গেলেও কেন এই যুদ্ধ শুরু করা হয়েছিল এবং এর চূড়ান্ত লক্ষ্য কী ছিল তা এখনো স্পষ্ট নয় বলে বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের দেওয়া ব্যাখ্যাগুলো সময়ের সঙ্গে বদলাতে থাকায় বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গন ও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন প্রথমে দাবি করেছিল, অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা। সে সময় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরান যেন কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করাই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য।
তবে পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা যায়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পরে ইঙ্গিত দেন, ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বেও পরিবর্তন আনার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর হোয়াইট হাউসে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, নৌবাহিনী, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা এবং অঞ্চলে সক্রিয় বিভিন্ন প্রক্সি গোষ্ঠীকে দুর্বল করতে চায়। তার মতে, এই অভিযানের বৃহত্তর লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
তবে যুদ্ধের পর ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতি কী হতে পারে বা অভিযানের মাধ্যমে কীভাবে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি হয়ে উঠবে না, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি বলে পর্যবেক্ষকরা উল্লেখ করেছেন।
এদিকে প্রশাসনের ভেতরেও অবস্থানের কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করা গেছে। হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ইরানে শাসনব্যবস্থা উৎখাত করা যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ছিল না। তিনি দাবি করেন, এ অভিযান কোনো শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের যুদ্ধ নয়, যদিও হামলার ফলে দেশটির রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিবর্তন এসেছে।
পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও হামলার বিষয়ে নতুন ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে হামলার বিষয়ে দৃঢ় অবস্থানে ছিল এবং এমন পরিস্থিতিতে তেহরানের পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী। সেই সম্ভাবনা বিবেচনায় রেখে আগাম পদক্ষেপ হিসেবে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মনে করেছিলেন, এই সময়টিই অভিযানের জন্য একটি বিশেষ সুযোগ।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে এই যুদ্ধ নিয়ে তীব্র বিতর্ক দেখা দিয়েছে। অনেক রিপাবলিকান সদস্য প্রকাশ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন জানালেও ডেমোক্র্যাট নেতারা এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, অভিযানের পেছনে সুস্পষ্ট কৌশল বা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য অ্যাডাম স্মিথ বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন এখনো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কোথায় এবং কতটা অগ্রসর হয়েছিল সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করেনি। তার মতে, সম্ভাব্য হুমকি সম্পর্কে পর্যাপ্ত গোয়েন্দা তথ্য প্রকাশ না হওয়ায় এই সামরিক পদক্ষেপের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
মার্কিন সিনেটে অনুষ্ঠিত এক শুনানিতেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। ডেমোক্র্যাট সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন প্রশ্ন তোলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্ত সংবিধানসম্মত ছিল কি না। তিনি মন্তব্য করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে একটি অবৈধ যুদ্ধ শুরু করেছেন এবং এটি শুধু অসাংবিধানিক নয়, বরং ঝুঁকিপূর্ণও।
শুনানিতে প্রতিরক্ষা বিভাগের আন্ডার সেক্রেটারি এলব্রিজ কলবি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইরান দ্রুতগতিতে ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়াচ্ছিল এবং সেই সম্ভাব্য হুমকির বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান এই উত্তেজনা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং আঞ্চলিক সংলাপই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।