রমজানে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য জরুরি সতর্কতা ও করণীয়
পবিত্র রমজান মাস এলেই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত অনেকের মনে একটি সাধারণ প্রশ্ন দেখা দেয়, ডায়াবেটিস থাকলে কি নিরাপদে রোজা রাখা সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক প্রস্তুতি, নিয়মিত রক্তে শর্করা পর্যবেক্ষণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে অনেক ক্ষেত্রেই ডায়াবেটিস নিয়েও নিরাপদভাবে রোজা পালন করা যায়।
চিকিৎসকরা বলছেন, যেসব রোগীর ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রিত এবং যারা নিয়মিত ওষুধ ও খাদ্যাভ্যাস মেনে চলেন, তারা সাধারণত রোজা রাখতে পারেন। তবে টাইপ ১ ডায়াবেটিস, ইনসুলিননির্ভর অবস্থা, ঘন ঘন রক্তে শর্করা কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়ার সমস্যা এবং ডায়াবেটিসজনিত জটিলতা থাকলে রোজা রাখা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই রমজান শুরু হওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা জানান, রোজার সময়ও রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। আঙুলে সূঁচ ফোটিয়ে রক্ত পরীক্ষা করলে রোজা ভেঙে যায় না, তাই এটি নিরাপদ এবং ধর্মীয়ভাবেও অনুমোদিত।
কিছু পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে রোজা ভেঙে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হয়। যদি রক্তে শর্করার মাত্রা ৩ দশমিক ৯ মিলিমোল প্রতি লিটারের নিচে নেমে যায় অথবা ১৬ দশমিক ৭ মিলিমোল প্রতি লিটারের বেশি হয়ে যায়, তখন দেরি না করে রোজা ভাঙা উচিত। এছাড়া মাথা ঘোরা, কাঁপুনি, অতিরিক্ত ঘাম, দুর্বলতা বা ঝিমুনি অনুভব করলেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। ইসলামে অসুস্থতার ক্ষেত্রে রোজা না রাখার অনুমতি থাকায় নিজের শারীরিক অবস্থার প্রতি সচেতন থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
রমজানে খাবারের সময়সূচি পরিবর্তিত হওয়ায় অনেক সময় ওষুধের মাত্রা সমন্বয় করার প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে কিছু ধরনের ওষুধ বা ইনসুলিন ব্যবহারে হঠাৎ রক্তে শর্করা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন না করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সাহরির সময় ধীরে হজম হয় এমন খাবার গ্রহণ করা ভালো। যেমন লাল আটা, ওটস, ডাল, ডিম ও সবজি দীর্ঘ সময় শক্তি জোগায় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে। অতিরিক্ত ভাজাপোড়া ও মিষ্টিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলা এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা প্রয়োজন।
ইফতারের সময় খেজুর ও পানি দিয়ে শুরু করা স্বাস্থ্যসম্মত বলে মনে করেন চিকিৎসকরা। এরপর হালকা খাবার খেয়ে কিছুটা বিরতি দেওয়া ভালো। একসঙ্গে অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ করলে হঠাৎ রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। ভাজাপোড়া, অতিরিক্ত মিষ্টি শরবত ও কোমল পানীয় সীমিত রাখা উচিত।
রোজার সময় ব্যায়াম করা সম্পূর্ণ নিষেধ নয়। তবে দিনের শেষভাগে বা বিকেলের দিকে ভারী ব্যায়াম এড়িয়ে চলা ভালো, কারণ তখন রক্তে শর্করা কমে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। ইফতারের পর হালকা হাঁটা বা তারাবির নামাজ শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকার ভালো উপায় হতে পারে।
চিকিৎসকরা মনে করিয়ে দেন, ডায়াবেটিস থাকলেই রোজা রাখা যাবে না এমন ধারণা সঠিক নয়। সঠিক পরিকল্পনা, সচেতনতা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অধিকাংশ ডায়াবেটিস রোগীই নিরাপদে রোজা পালন করতে পারেন।
রমজান শুরু হওয়ার আগে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ নেওয়া, খাদ্য ও ওষুধের পরিকল্পনা ঠিক করা এবং নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা সুস্থভাবে রোজা পালনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সচেতনতা ও যত্নের মাধ্যমে স্বাস্থ্য রক্ষা করেই ইবাদতের এই পবিত্র মাসের পূর্ণ সুফল লাভ করা সম্ভব।