বিদেশে জন্ম নেওয়া অশ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ নাগরিকদের দেশ ছাড়ার প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগ, জরিপে নতুন বিতর্ক
যুক্তরাজ্যে বিদেশে জন্ম নেওয়া অশ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ নাগরিকদের দেশ ছাড়তে উৎসাহিত বা বাধ্য করার ধারণা নিয়ে একটি জরিপ প্রকাশের পর নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিষয়টি ঘিরে প্রবাসী বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগের কথাও সামনে এসেছে।
লন্ডন থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী বুধবার ৪ মার্চ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়, ডানপন্থী রাজনৈতিক দল রিফর্ম ইউকে সম্পর্কিত একটি জরিপে অংশ নেওয়া সদস্যদের একটি অংশ বিদেশে জন্ম নেওয়া অশ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ নাগরিকদের যুক্তরাজ্য ত্যাগে উৎসাহিত করার পক্ষে মত দিয়েছেন।
বর্ণবাদবিরোধী সংগঠন হোপ নট হেট প্রকাশিত ওই জরিপে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারী রিফর্ম ইউকে সদস্যদের ৫৪ শতাংশ বিদেশে জন্ম নেওয়া অশ্বেতাঙ্গ নাগরিকদের দেশ ছাড়তে উৎসাহিত করার পক্ষে মত দিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রায় ২২ শতাংশ অংশগ্রহণকারী এমন নাগরিকদের ক্ষেত্রেও অনুরূপ অবস্থান সমর্থন করেছেন, যাদের বাবা মা যুক্তরাজ্যে জন্মগ্রহণ করেছেন।
সার্ভেশন নামের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ২৯ জানুয়ারি থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে এই জরিপ পরিচালনা করে। এতে রিফর্ম ইউকের ৬২৯ জন সদস্য অংশ নেন। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী দলটির সক্রিয় সদস্য সংখ্যা প্রায় দুই লাখ সত্তর হাজারের মতো।
হোপ নট হেট এর প্রধান নির্বাহী নিক লোলস জরিপের ফলাফল প্রসঙ্গে বলেন, যদি রিফর্ম ইউকে বৃহত্তর ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে তাদের নীতিগত অবস্থান পরিবর্তন করে বা ভবিষ্যতে সরকার গঠনের অবস্থানে পৌঁছায়, তাহলে দলের একটি অংশের সদস্যদের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে।
প্রতিবেদনটিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, দলটির ভেতরে ডানপন্থী বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রতি সমর্থন বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। নাইজেল ফারাজের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের বাইরে ডানপন্থী নেতা রুপার্ট লো এবং কর্মী টমি রবিনসনের প্রতিও কিছু সদস্যের সমর্থন রয়েছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। রুপার্ট লো সম্প্রতি রিস্টোর ব্রিটেন পার্টি নামে একটি নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ চালু করেছেন এবং বৃহৎ পরিসরে অভিবাসন নীতির পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
প্রতিবেদনটি সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাজ্যে কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে জাতিগত জাতীয়তাবাদের ধারণা বাড়তে দেখা যাচ্ছে। যেখানে জাতীয় পরিচয়কে রক্ত ও পূর্বপুরুষের ভিত্তিতে সংজ্ঞায়িত করার প্রবণতা দেখা দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, অভিবাসন সংক্রান্ত আলোচনায় ব্যবহৃত কিছু ভাষা অতীতে আলোচিত বিতর্কিত ধারণাগুলোকেও নতুনভাবে উপস্থাপন করছে।
একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে অভিবাসনবিরোধী কিছু সমাবেশ ও বিক্ষোভের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। লন্ডনে টমি রবিনসনের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত ইউনাইট দ্য কিংডম নামে একটি সমাবেশে এক লাখ পঞ্চাশ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। গত জুলাই মাসের পর থেকে অভিবাসনবিরোধী বিভিন্ন কর্মসূচির সংখ্যাও বাড়তে দেখা গেছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, শীতকালেও এসব বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল এবং কিছু সমাবেশে কয়েক হাজার মানুষ অংশ নেয়। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে গ্রীষ্মকালে এসব আন্দোলন আরও বড় আকার নিতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ ধরনের আলোচনা ও জরিপের ফলাফল যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বিভিন্ন অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশিসহ অনেক প্রবাসী নাগরিক মনে করছেন, বিষয়টি ভবিষ্যতের সামাজিক পরিবেশ ও অভিবাসন নীতির ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, যুক্তরাজ্যের দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, বহুসাংস্কৃতিক সমাজব্যবস্থা এবং আইনের শাসন দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করে আসছে। তাই মতভিন্নতা থাকলেও সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং নাগরিক অধিকারের প্রতি সম্মান বজায় থাকাই একটি সুস্থ সমাজ গঠনের মূল শক্তি।