দীর্ঘ প্রস্তুতির পর এক সন্ধিক্ষণে ইরান
ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহকে এক নির্ধারক অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক অভিযানের প্রথম ধাপেই দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বাসভবন লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার পর থেকেই সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে নানা জল্পনা শুরু হয়।
শনিবার সকাল থেকে স্যাটেলাইটচিত্রে তার কম্পাউন্ডের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ইঙ্গিত পাওয়া গেলে পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রথমদিকে ইরানি কর্তৃপক্ষ জানায়, খামেনিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ভাষণ দেওয়ার প্রস্তুতির খবর এলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। সন্ধ্যার দিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এক ভাষণে বলেন, বিভিন্ন ইঙ্গিত খামেনির মৃত্যুর দিকে নির্দেশ করছে। একই সময়ে ইসরাইলি ও মার্কিন গণমাধ্যমে অজ্ঞাত সূত্রের বরাতে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যেখানে তার মৃত্যুর পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য থাকার দাবি করা হয়। যদিও ইরানি কর্মকর্তারা তা অস্বীকার করে যাচ্ছিলেন।
কয়েক ঘণ্টা পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খামেনির মৃত্যুর খবর প্রকাশ করলে, ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনও তা নিশ্চিত করে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতির জন্য ইরান পূর্বপ্রস্তুতি নিয়েছিল। গত বছরের জুনে ইসরাইলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতের সময় সে প্রস্তুতি আরও জোরদার হয়। ওই সংঘাতে প্রথম রাতেই ইসরাইলের হামলায় নয়জন পরমাণু বিজ্ঞানী ও একাধিক নিরাপত্তা প্রধান নিহত হন। পরবর্তী দিনগুলোতে আরও জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ও অন্তত ৩০ জন উচ্চপদস্থ সামরিক কমান্ডার প্রাণ হারান। তখনই ধারণা করা হচ্ছিল, সর্বোচ্চ নেতাও লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে আসে, ওই সময় বিশেষ বাঙ্কারে অবস্থান করে খামেনি বিকল্প নেতৃত্ব কাঠামো নিয়ে কাজ করছিলেন। জরুরি পরিস্থিতিতে ক্ষমতার শীর্ষে শূন্যতা এড়াতে সম্ভাব্য দায়িত্বপ্রাপ্তদের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়। এছাড়া সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ৮৮ সদস্যের অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসকে সম্ভাব্য সব পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে তিনজন জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতার নাম বিবেচনায় ছিল। দীর্ঘদিন ধরেই খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনির নাম নিয়েও জল্পনা চলছিল।
খামেনির ৩৬ বছরের শাসনামলের অবসান তার সমর্থক ও ঘনিষ্ঠ মহলে গভীর প্রভাব ফেলেছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর আইআরজিসি, যারা দেশ ও বিদেশে ইসলামী বিপ্লব রক্ষার দায়িত্ব পালন করে, তাদের জন্যও এটি বড় ধাক্কা। তবে একই সঙ্গে বিবিসি যাচাই করা ভিডিওতে তেহরান ও কারাজের কিছু অংশে তার মৃত্যুসংবাদে উল্লাসের দৃশ্যও দেখা গেছে।
খামেনির শাসনামল পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাস এবং ইসরাইলবিরোধী কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিল। অভ্যন্তরীণ সংস্কার দাবির আন্দোলন ও ধারাবাহিক বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করা হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে সরাসরি সামরিক উত্তেজনা এবং অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের দাবির মুখে তার শাসন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবার দৃষ্টি সম্ভাব্য উত্তরসূরির দিকে। ক্ষমতার শীর্ষে এই পরিবর্তন ৪৭ বছরের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের নীতি ও কাঠামোয় কোনো বড় পরিবর্তন আনবে কি না, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, নতুন নেতৃত্বের প্রধান লক্ষ্য হবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, যেখানে ধর্মীয় নেতৃত্ব ও শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামো ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান করবে।
অঞ্চলজুড়ে চলমান সংঘাত এখনো শেষ হয়নি। বরং নতুন এই বাস্তবতায় তা আরও অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ পথে এগোচ্ছে। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে ইরান কেবল নেতৃত্বের পরিবর্তনের মুখোমুখি নয়, বরং ভবিষ্যৎ পথচলার এক কঠিন পরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।