মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন সমীকরণ, নীরবে এগোচ্ছে সুন্নি জোটের কূটনীতি
মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে দৃশ্যমান পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। সাম্প্রতিক কয়েকটি কৌশলগত মূল্যায়নে বলা হচ্ছে, তুরস্ক ও মিশরের নেতৃত্বে সুন্নি-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত একটি কূটনৈতিক প্রক্রিয়া নীরবে অগ্রসর হচ্ছে, যার সম্ভাব্য প্রভাব ইসরাইলসহ বৃহত্তর অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এই প্রবণতার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
ইসরাইলভিত্তিক সংবাদ প্ল্যাটফর্ম মিডা-তে প্রকাশিত এবং ইউরোপকেন্দ্রিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গেটস্টোন ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক আলোচনায় ইরান ইস্যু প্রাধান্য পেলেও সমান্তরালে সুন্নি দেশগুলোর মধ্যে একটি সমন্বিত কূটনৈতিক গতিশীলতা তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোগান আঙ্কারাকে কেন্দ্র করে সুন্নি-প্রধান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পর্ক জোরদারে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। এই প্রচেষ্টার লক্ষ্য কেবল অতীতের রাজনৈতিক বিরোধ নিরসন নয়, বরং একটি সমন্বিত রাজনৈতিক ও কৌশলগত বলয় গড়ে তোলা। বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন বাস্তবতা তৈরি হতে পারে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতে এরদোগানের সৌদি আরব ও মিশর সফর এবং পরবর্তীতে ইস্তাম্বুলে জর্ডানের রাজা দ্বিতীয় আবদুল্লাহকে আতিথ্য দেওয়াকে এই প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, ২০২২ সাল থেকে শুরু হওয়া তুরস্ক ও আরব দেশগুলোর সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের ধারাবাহিকতায় এই কূটনৈতিক তৎপরতা গতি পেয়েছে।
বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে তুরস্ক ও মিশরের সম্পর্কের দ্রুত উন্নয়ন। ২০১৩ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘ সময় ধরে শীতল থাকা সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন মাত্রা পেয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, কায়রো সফরের সময় প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের সামরিক সহযোগিতা কাঠামোতে সমঝোতা হয়েছে, যার আওতায় যৌথ অস্ত্র উৎপাদন, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং সামরিক মহড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যও সামনে রাখা হয়েছে।
কৌশলগত বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সুয়েজ খালের ওপর মিশরের নিয়ন্ত্রণ এবং উত্তর আফ্রিকা ও ভূমধ্যসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামোয় কায়রোর ভূমিকা এই সম্ভাব্য জোটকে কার্যকর ভিত্তি দিতে পারে। এর ফলে আঞ্চলিক সামুদ্রিক রুট এবং বাণিজ্যিক প্রবাহের ওপর নতুন রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে, যা ইসরাইলের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও সম্পৃক্ত।
তবে এ ধরনের বিশ্লেষণ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়, বরং কৌশলগত মূল্যায়নের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আঞ্চলিক কূটনীতিতে সমীকরণ পরিবর্তনশীল এবং বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণ ও পারস্পরিক সম্পর্কের গতিপ্রকৃতির ওপর।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা জোরালো হচ্ছে। শক্তির ভারসাম্য বদলালে শুধু রাষ্ট্রনীতিই নয়, প্রভাব পড়ে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক কৌশলগত অগ্রাধিকারে। পরিবর্তনের এই স্রোতে শেষ পর্যন্ত কোন সমীকরণ প্রাধান্য পাবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।