বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার চাপে, বলপ্রয়োগের রাজনীতি নিয়ে সতর্কবার্তা জাতিসংঘ মহাসচিবের
বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার এখন সরাসরি আক্রমণের মুখে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, বহু ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর ব্যক্তিরাই এ প্রবণতার অগ্রভাগে অবস্থান করছেন।
সোমবার জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের উদ্বোধনী অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, আইনের শাসনের পরিবর্তে বলপ্রয়োগের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
গুতেরেসের ভাষ্য অনুযায়ী, মানবাধিকারের ওপর আঘাত কোনো গোপন প্রক্রিয়ায় বা হঠাৎ করে ঘটছে না, বরং তা প্রকাশ্যেই সংঘটিত হচ্ছে এবং অনেক সময় ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিদের নেতৃত্বেই তা এগোচ্ছে। যদিও তিনি নির্দিষ্ট কোনো দেশের নাম উল্লেখ করেননি, তবে ইউক্রেনে রাশিয়ার চলমান যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে পরিস্থিতির সমালোচনা করেন। চার বছরের সংঘাতে সেখানে ১৫ হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির কথা উল্লেখ করে তিনি অবিলম্বে রক্তপাত বন্ধের আহ্বান জানান।
দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের পরিস্থিতিও তার বক্তব্যে গুরুত্ব পায়। সেখানে মানবাধিকার, মানব মর্যাদা এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রকাশ্য লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, চলমান বাস্তবতা দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাকে ক্রমশ দুর্বল করে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি এ পরিস্থিতি বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
মহাসচিব বলেন, কেবল সংঘাতপ্রবণ অঞ্চল নয়, বিশ্বজুড়েই মানবাধিকারের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ছে। তার পর্যবেক্ষণে, অনেক ক্ষেত্রে পরিকল্পিতভাবে এবং কৌশলগতভাবে মানবাধিকারকে পেছনে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, কখনো কখনো তা প্রকাশ্য গর্বের সঙ্গেও করা হচ্ছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমান বিশ্বে ব্যাপক মানবিক দুর্ভোগকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। মানুষকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক আইনকে অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় বোঝা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তার সতর্কবার্তা, মানবাধিকারের ভিত্তি ভেঙে পড়লে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার অন্যান্য স্তম্ভও টিকে থাকবে না।
গুতেরেস বলেন, যারা আগে থেকেই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন, তাদের আরও প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এ প্রবণতা বদলাতে জরুরি ও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, জাতিসংঘ সনদ, মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের দলিলসমূহ কোনোভাবেই বেছে নেওয়ার তালিকা নয়। রাষ্ট্রনেতারা নিজেদের সুবিধামতো কিছু অংশ গ্রহণ করে বাকিটুকু উপেক্ষা করতে পারেন না।
মানবাধিকার সুরক্ষাকে তিনি বৈশ্বিক শান্তি, ন্যায়বিচার ও টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে অভিহিত করেন। তার আহ্বান, সমষ্টিগত দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নীতিগত অবস্থানে অটল থাকতে হবে। কারণ মানব মর্যাদা রক্ষার লড়াই শুধু নীতির প্রশ্ন নয়, এটি মানবতার ভবিষ্যৎ রক্ষারও প্রশ্ন।