মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক বিভাজনে লিবিয়ায় রমজানের উচ্ছ্বাস ম্লান
রমজানকে ঘিরে উৎসব, পারিবারিক আয়োজন ও আলোকসজ্জায় প্রাণচাঞ্চল্য দেখা গেলেও লিবিয়ায় সাধারণ মানুষের আনন্দে ভাটা পড়েছে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ও দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতায়।
রোববার ২২ ফেব্রুয়ারি ত্রিপোলি থেকে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, অর্থনৈতিক চাপ ও প্রশাসনিক বিভাজন দেশটির জনজীবনকে গভীর সংকটে ফেলেছে।
দীর্ঘদিনের শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও লিবিয়া এখনো পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলভিত্তিক দ্বৈত ক্ষমতার কাঠামোয় বিভক্ত। বিপুল তেল ও গ্যাসসম্পদ থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতিতে নাগরিকরা দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
রমজান উপলক্ষে সাধারণত বাজারে কেনাকাটার চাপ বেড়ে যায়। তবে চলতি বছরে সুপারমার্কেটগুলো সীমিত পরিমাণে পণ্য বিক্রি করছে বলে জানা গেছে। অনেক পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না এবং রাজধানী ত্রিপোলির অধিকাংশ এটিএমে নগদ অর্থের সংকট দেখা দিয়েছে।
৩৭ বছর বয়সী ফিরাস জ্রিগ নামের এক বাসিন্দা বলেন, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। তার অভিযোগ, মুদ্রা ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে দিনারের দরপতন ঘটেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রান্নার তেলের দাম দ্বিগুণ হয়েছে, আর মাংস ও পোলট্রির মূল্য বেড়েছে প্রায় অর্ধেক।
সরকার নির্ধারিত দামে গ্যাস সিলিন্ডার সরবরাহের কথা থাকলেও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় তা মিলছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে কালোবাজারে একটি সিলিন্ডার ৭৫ দিনার বা তারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
২০১১ সালের আরব বসন্তের পর সৃষ্ট অস্থিরতা কাটিয়ে উঠতে এখনো সংগ্রাম করছে দেশটি। বর্তমানে জাতিসংঘ স্বীকৃত ত্রিপোলিভিত্তিক প্রশাসন এবং পূর্বাঞ্চলে সামরিক নেতা খলিফা হাফতার সমর্থিত কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিভক্ত রয়েছে লিবিয়া।
চলতি মাসে গাদ্দাফির ছেলে সাইফ আল ইসলাম গাদ্দাফি নিহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কিছু উন্নতি হয়েছে, তবুও সহিংসতার শঙ্কা পুরোপুরি দূর হয়নি।
গত মাসে পশ্চিমাঞ্চলীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক দিনারের মান প্রায় ১৫ শতাংশ কমিয়েছে, যা এক বছরের কম সময়ে দ্বিতীয়বারের মতো অবমূল্যায়ন। প্রধানমন্ত্রী আব্দুল হামিদ দবেইবা স্বীকার করেছেন, এ সিদ্ধান্তে নাগরিকদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বেড়েছে।
লিবিয়ায় জাতিসংঘ সহায়তা মিশনের প্রধান হান্না টেটেহ সতর্ক করে বলেছেন, দারিদ্র্য ও সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে। তিনি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে জানান, নাজুক নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে অর্থনৈতিক সংকট যুক্ত হলে নতুন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে একক জাতীয় বাজেট প্রণয়ন সম্ভব হচ্ছে না। দ্বৈত প্রশাসনিক কাঠামো ও তেল খাতের আয় কমে যাওয়ায় অর্থনীতি আরও চাপে পড়েছে।
গাদ্দাফি পতনের আন্দোলনের ১৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ত্রিপোলিতে আতশবাজির ঝলকানি দেখা গেলেও অনেক লিবীয় নাগরিকের বাস্তবতা এখনো কঠিন। নিরাপত্তায় সামান্য অগ্রগতি থাকলেও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া স্বস্তি ফিরবে না—এমনটাই মনে করেন স্থানীয়রা। শান্তি, স্থিতিশীলতা ও ন্যায্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই এখন রমজানের এই সময়ে তাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।