জানুয়ারিতে ৫৫২ সড়ক দুর্ঘটনা, মোটরসাইকেলেই সর্বাধিক প্রাণহানি
চলতি বছরের প্রথম মাসে দেশে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা পাঁচ শতাধিক ছাড়িয়েছে, যেখানে প্রাণহানির বড় অংশই ঘটেছে মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্ট ঘটনায়।
রোববার ২২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
সংগঠনটির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরীর স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জানুয়ারি মাসে সারা দেশে ৫৫২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৪৬ জন নিহত এবং ১২০৪ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ২২৩ জনের এবং আহত হয়েছেন ১৩২ জন। মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৩৮ শতাংশ এবং নিহতের প্রায় ৪১ শতাংশই মোটরসাইকেল সম্পৃক্ত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণ করে সংগঠনটির দুর্ঘটনা মনিটরিং সেল এ পরিসংখ্যান প্রস্তুত করেছে।
বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দুর্ঘটনার শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বিভাগ। এখানে ১৩২টি দুর্ঘটনায় ১৩৩ জন নিহত ও ৩২৮ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটেছে সিলেট বিভাগে, যেখানে ২৯টি ঘটনায় ২৮ জনের মৃত্যু এবং ৬৩ জন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
দুর্ঘটনায় জড়িত মোট ৮২৯টি যানবাহনের মধ্যে সর্বোচ্চ ২৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ ছিল মোটরসাইকেল। এছাড়া ট্রাক, পিকআপ, কাভার্ডভ্যান ও লরি মিলিয়ে ২৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ, বাস ১৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ এবং ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক ১৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ ঘটনায় জড়িত ছিল। অন্যান্য যানবাহনও বিভিন্ন হারে দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত হয়েছে।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় ৪৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ ঘটনায় গাড়িচাপা, ২৮ দশমিক ৬২ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ এবং ১৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে। অল্প কিছু ক্ষেত্রে ট্রেন ও যানবাহনের সংঘর্ষসহ অন্যান্য কারণও চিহ্নিত হয়েছে।
সড়কের ধরন অনুযায়ী জাতীয় মহাসড়কে সবচেয়ে বেশি ৪২ দশমিক ৫৭ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে। আঞ্চলিক মহাসড়কে ২৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং ফিডার রোডে ২৪ দশমিক ০৯ শতাংশ দুর্ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। ঢাকা মহানগরীতে ৪ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং চট্টগ্রাম মহানগরীতে শূন্য দশমিক ৫৪ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মতে, সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনায় নীতিগত দুর্বলতা ও তদারকির ঘাটতি, নিয়ন্ত্রণহীন যান চলাচল, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ট্রাফিক আইন অমান্য এবং সড়ক অবকাঠামোর ত্রুটি দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বেপরোয়া গতিতে যান চালানো পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
দুর্ঘটনা রোধে সংগঠনটি ১৪ দফা সুপারিশ তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে দক্ষ চালক তৈরির কার্যকর উদ্যোগ, ডিজিটাল পদ্ধতিতে যানবাহনের ফিটনেস সনদ প্রদান, সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ, মহাসড়কে সার্ভিস লেন ও পথচারী নিরাপত্তা সুবিধা বাড়ানো, চাঁদাবাজি বন্ধ, মানসম্মত সড়ক নির্মাণ এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন অপসারণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক নিরাপত্তা কেবল পরিসংখ্যানের বিষয় নয়, এটি প্রতিটি পরিবারের স্বপ্ন ও জীবনের সঙ্গে জড়িত। কার্যকর উদ্যোগ, দায়িত্বশীল আচরণ এবং আইনের কঠোর প্রয়োগই পারে অকাল প্রাণহানি রোধ করতে। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি, কারণ প্রতিটি প্রাণই অমূল্য, প্রতিটি জীবনই একটি পরিবারের পৃথিবী।