পোস্টাল ভোটে অনীহা সরকারি কর্মচারীদের, নিবন্ধন করেছেন মাত্র পাঁচ লাখের কিছু বেশি
নির্বাচনের আর মাত্র আটদিন বাকি থাকলেও পোস্টাল ভোটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম দেখা যাচ্ছে। এবারই প্রথম অনলাইনে পোস্টাল ভোটের নিবন্ধন চালু হলেও নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত ১৭ লাখ কর্মীর মধ্যে মাত্র ৫ লাখ ১৮ হাজার ৬০৩ জন নিবন্ধন করেছেন। ফলে নিবন্ধনের বাইরে থাকা প্রায় ১২ লাখ সদস্য অনীহার কারণে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বিভিন্ন সরকারি চাকরিজীবীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভোটের দায়িত্ব পালন এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা তাদের মধ্যে বেশি কাজ করছে। অনেকেই মনে করছেন নির্বাচনের দায়িত্বে ব্যস্ত থাকায় ভোট দেওয়ার বিষয়ে আলাদা করে প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আবার যাদের নির্বাচনী দায়িত্ব নেই, তাদের বড় একটি অংশও এবারের নির্বাচনে ভোট দিতে এলাকায় যাওয়ার বিষয়ে নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি বিবেচনা করছেন। অনেকের মোবাইলে পোস্টাল ব্যালট পৌঁছানোর বার্তা এলেও তা গ্রহণে তেমন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না।
স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকে পোস্টাল ভোট ব্যবস্থা থাকলেও দীর্ঘদিন এটি তেমন পরিচিত ছিল না। এবার প্রথমবার অনলাইনে নিবন্ধনের ব্যবস্থা চালু করা হয়। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, তারা এ বিষয়ে প্রচার করেছে, তবে অনেক সরকারি কর্মচারীর অভিযোগ, বিষয়টি তারা যথাযথভাবে জানতেন না।
দেশের প্রায় ২০ লাখ সরকারি কর্মচারীর বড় অংশ নিজ ভোটার এলাকার বাইরে কর্মরত থাকেন। রাজধানীতে কর্মরত অনেকের মধ্যেই ভোট না দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। কেউ কেউ বলেছেন, নির্বাচনের দায়িত্বের চাপ বেশি থাকায় পোস্টাল ভোটে নিবন্ধনের বিষয়ে ভাবা হয়নি। আবার অনেকে মনে করছেন, নিবন্ধন প্রক্রিয়াটি জটিল হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তারা আবেদন সম্পন্ন করতে পারেননি।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে মোট ১৬ লাখ ৮২ হাজার ৩৮২ জন দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে প্রিজাইডিং অফিসার ৪২ হাজার ৭৭৯ জন, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ জন এবং পোলিং অফিসার ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৯৬৪ জন। সব মিলিয়ে ভোটগ্রহণকারী কর্মকর্তার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ জন।
অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৮ লাখ ৯৭ হাজার ১১৭ জন সদস্য ভোটের মাঠে দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ১ লাখ, আনসার ও ভিডিপির ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৩১৪, পুলিশের ১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৪৩, বিজিবির ৩৭ হাজার ৪৫৩, ফায়ার সার্ভিসের ১৩ হাজার ৩৯০, র্যাবের ৭ হাজার ৭০০, নৌবাহিনীর ৫ হাজার, বিমানবাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০ এবং কোস্ট গার্ডের ৩ হাজার ৫৮৫ জন দায়িত্ব পালন করবেন।
প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়ে কর্মরত কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, নির্বাচনী দায়িত্বের কারণে পোস্টাল ভোটে তাদের আগ্রহ কম ছিল। একজন কর্মকর্তা বলেন, পরিবারকে এলাকায় পাঠানোর বিষয়েও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা জানান, পোস্টাল ভোট অনলাইনে নিবন্ধনের বিষয়টি তিনি বিস্তারিত জানতেন না।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী মো. সামছুল আলম জানান, পরে নির্বাচনী দায়িত্ব পাওয়ার পর পোস্টাল ভোটে নিবন্ধনের চেষ্টা করেছিলেন, তবে শেষ পর্যন্ত করতে পারেননি। একই মন্ত্রণালয়ের আরও কয়েকজন কর্মী বলেন, নিবন্ধনের প্রক্রিয়াটি তাদের কাছে কিছুটা জটিল মনে হয়েছে।
ব্যাংক খাতেও একই চিত্র দেখা গেছে। রাজধানীর গুলিস্তানের একটি ব্যাংক শাখার একজন কর্মকর্তা জানান, তাদের শাখায় ২৩ জন কর্মীর মধ্যে ছয়জন নির্বাচনের দায়িত্ব পেয়েছেন, তবে পোস্টাল ভোটে নিবন্ধন করেছেন মাত্র দুজন।
এদিকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, স্কুলের কাজ এবং নির্বাচনী দায়িত্ব একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে পোস্টাল ভোটে নিবন্ধনের জন্য সময় বের করা সম্ভব হয়নি। তার মতে, অনেক শিক্ষকই বিষয়টিতে আগ্রহ দেখাননি, যদিও কিছু শিক্ষক নিবন্ধন করেছেন।
নির্বাচন কমিশনের ৩১ জানুয়ারির তথ্য অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোট দিতে পোস্টাল ভোট বিডি অ্যাপের মাধ্যমে দেশে ও প্রবাসী মিলিয়ে ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৪ জন ভোটার নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৫৯ জন প্রবাসী ভোটার ভোটদান সম্পন্ন করেছেন। পোস্টাল ভোটে নিবন্ধনকারী ৭ লাখ ৬৬ হাজার ৮৬২টি ব্যালট সংশ্লিষ্ট গন্তব্য দেশে পৌঁছেছে এবং ৫ লাখ ১৮ হাজার ৩৪৫ প্রবাসী ভোটার ব্যালট গ্রহণ করেছেন। এছাড়া ১ লাখ ৪৪ হাজার ৮৬০ জন প্রবাসীর ভোটের ব্যালট বাংলাদেশে পৌঁছেছে।
দেশের ভেতরে পোস্টাল ভোটের জন্য নিবন্ধনকারী ৫ লাখ ১৮ হাজার ৬০৩ ভোটারের কাছে ব্যালট পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন। তবে মাত্র ৭ হাজার ৩৬৭ জন ভোটার ব্যালট গ্রহণ করেছেন এবং তাদের মধ্যে ৪ হাজার ৯০২ জন ভোটদান সম্পন্ন করেছেন।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, অনেকেই শুরুতে মনে করেছিলেন তাদের নির্বাচনী দায়িত্ব পড়বে না এবং তারা নিজ এলাকায় গিয়ে ভোট দেবেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে দায়িত্ব পাওয়ার পর তাড়াহুড়ো করে নিবন্ধন করতে গিয়ে অনেকে বাদ পড়ে যেতে পারেন। পোস্টাল ভোট সম্পর্কে অনেকে জানেন না এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এত প্রচারের পরও কেউ যদি বলে বিষয়টি জানে না, তাহলে এ নিয়ে মন্তব্য করার কিছু নেই। পোস্টাল ভোটের নিবন্ধন কম হয়েছে কি না, সে বিষয়ে ভোটের পর বিস্তারিত বলা যাবে বলেও জানান তিনি।
ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ যখন হাতের কাছে থাকে, তখন সামান্য অসচেতনতা বা অনীহাই অনেক সময় বড় আফসোসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।