সিলেটের সড়কে বছরের প্রথম মাসে ঝরেছে ১৮ প্রাণ
নতুন বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে সিলেট বিভাগে সড়ক দুর্ঘটনায় ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। দেশে মোট দুর্ঘটনা ও প্রাণহানার তুলনায় এ সংখ্যা কম হলেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৃহস্পতিবার ১৯ ফেব্রুয়ারি রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমানের পাঠানো জানুয়ারি মাসের সড়ক দুর্ঘটনা সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। ৯টি জাতীয় দৈনিক, ৭টি অনলাইন পোর্টাল, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম ও সংস্থার নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রণয়ন করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারিতে সারা দেশে ৫৫৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪৮৭ জন এবং আহত হয়েছেন ১ হাজার ১৯৪ জন। নিহতদের মধ্যে নারী ৬৮ জন এবং শিশু ৫৭ জন। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। ২০৮টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৯৬ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট মৃত্যুর ৪০ দশমিক ২৪ শতাংশ।
সিলেট বিভাগে দুর্ঘটনার সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও ২৪টি দুর্ঘটনায় ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৮ ফেব্রুয়ারি পৃথক দুটি ঘটনায় এক মোটরসাইকেল চালক ও একটি টমটমের যাত্রী প্রাণ হারান।
বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১৪৩টি দুর্ঘটনায় ১১৯ জন নিহত হয়েছেন। রাজধানী ঢাকায় ২৬টি দুর্ঘটনায় ১৮ জনের মৃত্যু এবং ৪১ জন আহত হয়েছেন।
যানবাহনভিত্তিক বিশ্লেষণে মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ১৯৬ জন, বাসের যাত্রী ২১ জন, ট্রাক ও ভারী যানবাহনের আরোহী ২৮ জন, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসের যাত্রী ৯ জন, থ্রি হুইলার যাত্রী ৭৭ জন, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী ১৩ জন এবং বাইসাইকেল আরোহী ১১ জন নিহত হয়েছেন।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে ১৩৫টি মুখোমুখি সংঘর্ষ, ২০৯টি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ১৩৭টি পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দিয়ে, ৭২টি পেছন থেকে আঘাত এবং ৬টি অন্যান্য কারণে ঘটেছে। সড়কের ধরন অনুযায়ী ১৫৬টি জাতীয় মহাসড়কে, ২০৭টি আঞ্চলিক সড়কে, ৮৫টি গ্রামীণ সড়কে, ১০৩টি শহরের সড়কে এবং ৮টি অন্যান্য স্থানে দুর্ঘটনা ঘটেছে।
মোট ৮৮৫টি যানবাহন এসব দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল। এর মধ্যে বাস ১০৮টি, ট্রাক ১৪৪টি, কাভার্ডভ্যান ১৬টি, পিকআপ ৩২টি, ট্রাক্টর ২১টি, মোটরসাইকেল ২১৭টি, থ্রি হুইলার ১৬৪টি, স্থানীয়ভাবে তৈরি যান ৩৫টি, বাইসাইকেল ৮টি, রিকশা ১১টি এবং অজ্ঞাত যান ৪৮টি।
নিহতদের মধ্যে বিভিন্ন পেশার মানুষ রয়েছেন, যেমন পুলিশ সদস্য, শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, আইনজীবী, ব্যাংক ও বীমা কর্মকর্তা, এনজিও কর্মী, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও শিক্ষার্থী।
প্রতিবেদনে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়কব্যবস্থা, বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা ও বেতন কাঠামোর অভাব, মহাসড়কে স্বল্পগতির যান চলাচল, ট্রাফিক আইন অমান্য, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের সক্ষমতার ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি গণপরিবহনে চাঁদাবাজিকেও ঝুঁকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সুপারিশ হিসেবে দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ বৃদ্ধি, চালকদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ও বেতন কাঠামো নির্ধারণ, বিআরটিএর সক্ষমতা বাড়ানো, ট্রাফিক আইনের কার্যকর প্রয়োগ, মহাসড়কে সার্ভিস রোড ও ডিভাইডার নির্মাণ, গণপরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ, রেল ও নৌপথ উন্নয়ন এবং সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি সংখ্যা একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের গল্প। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় মানবিক দায়িত্ব।