হাজারো মার্কিন নাগরিক কেন ছাড়ছেন নিজেদের নাগরিকত্ব
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত ক্রমবর্ধমান সংখ্যক মার্কিন নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। রাজনৈতিক হতাশা, কর সংক্রান্ত জটিলতা, ব্যক্তিগত পরিচয়ের সংকট এবং নতুন দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের আকাঙ্ক্ষা এই প্রবণতার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
নিউজিল্যান্ডে বসবাসরত ৩৪ বছর বয়সী এরিন ক্ল্যাট এই পরিবর্তনের একটি আলোচিত উদাহরণ। ২০১৬ সালে ওয়ার্কিং হলিডে ভিসায় দেশটিতে যাওয়ার পর তিনি সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন। দুগ্ধ খামারে কাজ করতে গিয়ে তিনি দীর্ঘমেয়াদি ভিসা লাভ করেন এবং পরে এক ব্রিটিশ নাগরিককে বিয়ে করেন। ২০২৫ সালের মে মাসে তারা দুজনই নিউজিল্যান্ডের নাগরিকত্ব অর্জন করেন।
এরপর ক্ল্যাট যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি এবং বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়কার রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই তিনি অসন্তুষ্ট ছিলেন। পাশাপাশি বিদেশে বসবাসকারী মার্কিন নাগরিকদের ওপর আরোপিত কর সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতাও তার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।
চলতি বছরের শুরুতে নাগরিকত্ব ত্যাগের জন্য তিনি ২ হাজার ৩৫০ ডলার ফি পরিশোধ করেন। পরে মার্কিন কনস্যুলেটে আনুষ্ঠানিক শপথের মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করেন। তার ভাষায়, এ সিদ্ধান্ত নিয়ে তার কোনো অনুশোচনা নেই।
নাগরিকত্ব ত্যাগকারীর প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা সহজ নয়। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এ সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করে না। তবে বিদেশে বসবাসকারী মার্কিন নাগরিকদের নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান আমেরিকেন্স ওভারসিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আইআরএসের তালিকায় ৪ হাজার ৮৮৯ জন নাগরিকত্ব ত্যাগকারীর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ২০২০ সালের পর এটিই সর্বোচ্চ সংখ্যা।
প্রতিষ্ঠানটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নাগরিকত্ব ত্যাগ বিষয়ে আগ্রহী মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাদের ধারণা, গত বছরের তুলনায় এ বছর এ প্রবণতা প্রায় ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ৪০ হাজার মার্কিন নাগরিককে এ বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনৈতিক কারণও এ প্রবণতার অন্যতম চালিকাশক্তি। বিদেশে বসবাস করলেও মার্কিন নাগরিকদের বৈশ্বিক আয়ের ওপর কর সংক্রান্ত বিভিন্ন বাধ্যবাধকতা পালন করতে হয়। ফলে অনেকেই নাগরিকত্ব ত্যাগকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে বিবেচনা করছেন।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন তথাকথিত অ্যাকসিডেন্টাল আমেরিকানরা। তারা জন্মসূত্রে বা পারিবারিক সূত্রে মার্কিন নাগরিকত্ব পেলেও কখনো যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস বা কর্মজীবন গড়ে তোলেননি। তবু তাদের ওপর একই ধরনের কর ও প্রশাসনিক নিয়ম প্রযোজ্য হয়।
অন্যদিকে অনেকের কাছে বিষয়টি কেবল অর্থনীতি বা রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইতালিতে বসবাসরত দ্বৈত নাগরিক ক্যারোলিন চিরিকেল্লার মতে, দুই দেশের নাগরিকত্ব বহন করার ফলে অনেক সময় পরিচয়ের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। তিনি মনে করেন, একটি দেশের নাগরিকত্ব ধরে রাখলে সেই সংকট কিছুটা কমতে পারে।
তবে নাগরিকত্ব ত্যাগের পথ সহজ নয়। আবেদনকারীর আগে অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব থাকতে হয়। পাশাপাশি কমপক্ষে পাঁচ বছরের কর সংক্রান্ত নথি হালনাগাদ করতে হয়। উচ্চ সম্পদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কর ও জটিল নিয়মও প্রযোজ্য হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, নাগরিকত্ব ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ভালোভাবে বিবেচনা করা জরুরি। কারণ একবার নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে যুক্তরাষ্ট্রে অবাধে বসবাস ও কাজ করার অধিকার হারিয়ে যায়। ভবিষ্যতে দেশটিতে প্রবেশের জন্য ভিসার প্রয়োজন হতে পারে এবং সেই অনুমতি পাওয়া নিশ্চিত নয়।
রাজনীতি, অর্থনীতি, ব্যক্তিগত পরিচয় এবং জীবনযাত্রার নতুন বাস্তবতা মিলিয়ে মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রবণতা বিশ্বজুড়ে নতুন এক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী বছরগুলোতেও এই ধারা অব্যাহত থাকতে পারে।