শিক্ষা বাজেট বাস্তবায়নের বড় বাধা দুর্নীতি ও অপচয়, মনে করেন অধিকাংশ শিক্ষার্থী
দেশের শিক্ষা বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও তহবিলের অপচয়কে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখছেন অধিকাংশ শিক্ষার্থী। একই সঙ্গে তারা শিক্ষা খাতে মোট দেশজ উৎপাদনের অন্তত পাঁচ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
শুক্রবার (৫ জুন) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষা অধিকার সংসদ পরিচালিত এক জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। জরিপের তথ্য ও সুপারিশমালা তুলে ধরেন সংগঠনটির সদস্য সচিব এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহনেওয়াজ খান চন্দন।
জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন, শিক্ষার্থীদের মতামত ও প্রত্যাশা শীর্ষক এ জরিপে দেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৩৫০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৫০ শতাংশই শিক্ষা বিষয়ে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।
জরিপে দেখা গেছে, ৬২ দশমিক ৩ শতাংশ শিক্ষার্থী শিক্ষা খাতে জিডিপির অন্তত পাঁচ শতাংশ বা তার বেশি বরাদ্দ প্রত্যাশা করেন। অন্যদিকে ৬৭ দশমিক ৭ শতাংশ শিক্ষার্থী মনে করেন, শিক্ষা বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা দুর্নীতি ও অর্থের অপচয়। এছাড়া ৫০ দশমিক ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী রাজনৈতিক ও অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক হস্তক্ষেপকে বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুতর বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
ফলাফলে আরও উঠে এসেছে, ৫৫ দশমিক ৭ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। তাদের মতে, মানবসম্পদ উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে ওঠে প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমে এবং এই স্তর শক্তিশালী না হলে উচ্চশিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মান অর্জন সম্ভব নয়।
অন্যদিকে ৩০ দশমিক ৩ শতাংশ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা খাতে অধিক বিনিয়োগের পক্ষে মত দিয়েছেন। তারা গবেষণা, উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দেশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য উচ্চশিক্ষায় বাড়তি বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। এছাড়া ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাকে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষে মত প্রকাশ করেন।
জরিপের ভিত্তিতে শিক্ষা অধিকার সংসদ সরকারের কাছে ১২ দফা সুপারিশও তুলে ধরেছে। এর মধ্যে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ থেকে ৬ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করা, জাতীয় শিক্ষক নিয়োগ কমিশন গঠন, শিক্ষক বেতন কাঠামোর সংস্কার, গবেষণা ও উদ্ভাবন তহবিল প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
সুপারিশে আরও বলা হয়েছে, মাধ্যমিক স্তর থেকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোডিং, ডেটা সায়েন্স এবং স্টেমভিত্তিক শিক্ষা সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার আধুনিকায়ন, শিল্প খাতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পাঠক্রম প্রণয়ন এবং ল্যাবরেটরি উন্নয়নে বিশেষ বরাদ্দের আহ্বান জানানো হয়েছে।
এছাড়া দুর্গম ও পিছিয়ে থাকা অঞ্চলে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগে বিশেষ ভাতা চালু, শিক্ষা বাজেট তদারকিতে পৃথক জবাবদিহি ব্যবস্থা গঠন, ডিজিটাল অডিট প্রক্রিয়া চালু এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার জন্য জাতীয় শিক্ষা পরিকল্পনা কমিশন প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করা হয়েছে।
শিক্ষা অধিকার সংসদের মতে, শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দের পাশাপাশি সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত উন্নয়ন এবং টেকসই মানবসম্পদ গঠনের পথ আরও সুগম হবে।