সিটি ও জেলা পরিষদে রাজনৈতিক প্রশাসক, স্থানীয় সরকার নিয়ে নতুন বিতর্ক
দেশের সিটি করপোরেশনগুলোর পর এবার ৪২টি জেলা পরিষদেও রাজনৈতিক নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। এই সিদ্ধান্তে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। একদিকে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা গেলেও অন্যদিকে এসব প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক পুনর্বাসনের জায়গায় পরিণত হচ্ছে কি না সে প্রশ্নও উঠেছে বিভিন্ন মহলে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন অকার্যকর হয়ে থাকা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্রিয় করতে রাজনৈতিক প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার কারণে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে অনেক ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের চেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।
বাংলাদেশে বর্তমানে ১২টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা, ৬৪টি জেলা পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ এবং প্রায় ৪ হাজার ৫৭০টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করা হয়। সে সময় অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জনপ্রতিনিধিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
পরবর্তী সময়ে এসব প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভায় এখনো সরকারি কর্মকর্তারা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন। তবে সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠিত হলে সিটি করপোরেশনগুলোতে সরকারি কর্মকর্তাদের সরিয়ে দলীয় নেতাদের প্রশাসক করা শুরু হয়।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিসহ কয়েকটি সিটি করপোরেশনে রাজনৈতিক প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক করা হয় বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আবদুস সালামকে। ঢাকা উত্তর সিটিতে প্রশাসক করা হয় ঢাকা ১৫ আসনে নির্বাচনে অংশ নেওয়া বিএনপি নেতা শফিকুল ইসলাম খানকে।
এছাড়া খুলনায় বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জু, গাজীপুরে মহানগর বিএনপি সভাপতি শওকত হোসেন সরকার, নারায়ণগঞ্জে মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি সাখাওয়াত হোসেন এবং সিলেটে জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরীকে প্রশাসক করা হয়েছে।
এরপর ১৪ মার্চ বরিশাল, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, রংপুর ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনেও বিএনপি নেতাদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সর্বশেষ গত রোববার সরকার এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দেশের ৪২টি জেলা পরিষদেও দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়।
সরকার আশা প্রকাশ করেছে যে নতুন প্রশাসকরা দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে জেলা পরিষদগুলোর প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল ও কার্যকর হবে।
তবে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রশাসনিক দায়িত্বে রাজনৈতিক নেতাদের নিয়োগ কিছু ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে হলেও দ্রুত নির্বাচন আয়োজনই স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার মূল উপায়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং স্থানীয় সরকার কমিশনের সদস্য তারিকুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় সরকার কার্যকর করতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির বিকল্প নেই। তবে নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রশাসকরা সরকারি কর্মকর্তাদের তুলনায় অনেক সময় বেশি সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
অন্যদিকে স্থানীয় সরকার কমিশনের আরেক সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, কমিশনের সুপারিশে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রভাব কমানোর জন্য নির্দলীয় পদ্ধতিতে নির্বাচন এবং জনগণের সরাসরি ভোটে প্রতিনিধি নির্বাচনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইপিডির নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পরিবর্তে প্রশাসক দিয়ে স্থানীয় সরকারের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা কঠিন। তার মতে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে পূর্ণাঙ্গ কাঠামোয় ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।
এদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন আলোচনা রয়েছে যে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া অনেকেই সাম্প্রতিক সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন অথবা দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। ফলে এই নিয়োগকে কেউ কেউ রাজনৈতিক সমন্বয় বা পুরস্কার হিসেবেও দেখছেন।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জনগণের সেবা নিশ্চিত করা এবং স্থবির হয়ে থাকা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে সক্রিয় করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টিও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।