বৃষ্টি বরণ বইমেলার স্মরণীয় মুহূর্তের কিছু কথা মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী
বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে অমর একুশে বইমেলা মানেই এক অন্যরকম আবহ। কবি, সাহিত্যিক, পাঠক আর বইপ্রেমীদের মিলনে সেখানে প্রতিদিনই সৃষ্টি হয় নতুন নতুন স্মৃতি। তেমনি এক বিকেল আজও মনে পড়ে, যখন সাহিত্য আড্ডা, বইয়ের মোড়ক উন্মোচন আর আকস্মিক ঝড়বৃষ্টি মিলিয়ে দিনটি হয়ে উঠেছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
জুমার নামাজ আদায়ের পর প্রিয় কবি ডক্টর সাহেদ মন্তাজকে সঙ্গে নিয়ে শেওড়াপাড়ায় নামাজ আদায় করি। সেখান থেকে আমরা রওনা দিই বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে চলমান বইমেলার উদ্দেশ্যে। শেওড়াপাড়া মেট্রোরেল স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় বেশ কিছুক্ষণ, কারণ চারদিকে বইপ্রেমী মানুষের উপচে পড়া ভিড়। সবাই যেন ছুটে চলেছে প্রিয় বইমেলার টানে।
বইমেলায় এসে যোগ দিই কবি ও শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আলী খান মানিক রচিত গ্রন্থ সপ্তর্ষি তোকে খুঁজে ফিরি এর মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে। একই আয়োজনে লিপি আক্তারের প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত আবু ওবাইদ বাদলের নীল বেদনার কাব্য এবং নূর গণি ইসলামের রচিত দূর্গমের দীপ শিখা আবদুল হামিদ মাস্টার বই দুটিরও মোড়ক উন্মোচন সম্পন্ন হয়। অনুষ্ঠানে কবি, লেখক, কলামিস্ট ও সাংবাদিকসহ নানা অঙ্গনের অনেক গুণীজন উপস্থিত ছিলেন।
ইফতারের পর বইমেলার লেখক মঞ্চে শুরু হয় আরেকটি আকর্ষণীয় আয়োজন। সেখানে বিশিষ্ট কবি লেখকদের সম্মাননা প্রদান এবং সাক্ষাৎকার পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। সেই দিনের আলোকিত মুখ ছিলেন কবি মোহন রায়হান। তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন বাংলা একাডেমির উপ পরিচালক কবি ডক্টর সাহেদ মন্তাজ। কথোপকথনের মধ্য দিয়ে কবি মোহন রায়হান তাঁর জীবনদর্শন, সাহিত্য ভাবনা ও অভিজ্ঞতার নানা দিক তুলে ধরেন।
প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রথম প্রশ্ন করেন প্রখ্যাত শিল্পী জাকির হোসেন আখের। উপস্থিত আরও অনেকেই বিভিন্ন প্রশ্নের মাধ্যমে আলোচনাকে প্রাণবন্ত করে তোলেন। কিন্তু ঠিক তখনই প্রকৃতি যেন নিজের উপস্থিতি জানান দেয়। হঠাৎ করেই আকাশ কালো হয়ে আসে, শুরু হয় প্রবল ঝড়বৃষ্টি। মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে অন্ধকার নেমে আসে এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
দীর্ঘদিন পর ঢাকার গাছপালা যেন বৃষ্টির জলে ভিজে প্রাণ ফিরে পায়। লেখক মঞ্চের নিচে কয়েকশ মানুষ আশ্রয় নেয়। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে চলতে থাকে সেই ঝড়বৃষ্টি। পরে ধীরে ধীরে আবহাওয়া শান্ত হয়, ফিরে আসে আলো।
পরিবেশ আবার প্রাণ ফিরে পেলে কবি মোহন রায়হান হঠাৎ গানের আয়োজনের কথা বলেন। উপস্থিত কণ্ঠশিল্পী জাকির হোসেন আখেরের নেতৃত্বে শুরু হয় গান। আউয়াল খন্দকারসহ আরও অনেকেই সেই গানে অংশ নেন। গানের সুর, আড্ডা আর উচ্ছ্বাসে আবারও মুখর হয়ে ওঠে বইমেলার পরিবেশ।
বৃষ্টি থেমে গেলে বাংলা একাডেমির পথঘাটে আবার নেমে আসে মানুষের ঢল। বইপ্রেমী মানুষের ভিড়, সাহিত্যিকদের প্রাণবন্ত আড্ডা আর প্রকৃতির বৃষ্টিধারা মিলিয়ে সেই দিনের অভিজ্ঞতা আজও মনে দাগ কেটে আছে।
উল্লেখ্য, এর আগের দিন লন্ডন প্রবাসী বিশিষ্ট কবি ও লেখক মোহাম্মদ রহমত আলীর দুটি গ্রন্থ আমি যখন চলে যাব এবং গল্প নয় বাস্তব এর প্রকাশনা অনুষ্ঠানও বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়, যা বইমেলার সাহিত্যিক আবহকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে।