দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত কর্তৃপক্ষ গঠনের পরিকল্পনা সরকারের
বাংলাদেশে দুর্যোগ মোকাবিলায় সমন্বয় জোরদার এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করতে নতুন একটি সমন্বিত কর্তৃপক্ষ গঠনের পরিকল্পনা করছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দুর্যোগ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রম একটি অভিন্ন কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের অধীন বা সংশ্লিষ্ট একাধিক সংস্থা আলাদা প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে কাজ করছে। এতে মাঠপর্যায়ে সমন্বয়ের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হচ্ছে এবং ব্যয়ও বাড়ছে।
মঙ্গলবার ১১ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে মতবিনিময় হওয়ার কথা রয়েছে। ওই বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের চলমান কার্যক্রম, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় সমন্বিত কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাব উপস্থাপন করা হতে পারে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত বিভিন্ন সংস্থাকে এক ছাতার নিচে এনে একটি স্বতন্ত্র কর্তৃপক্ষ গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে দুর্যোগ মোকাবিলা, উদ্ধার কার্যক্রম, ত্রাণ বিতরণ, প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতামূলক কর্মসূচি একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, সাইক্লোন প্রিপেয়ার্ডনেস প্রোগ্রাম সিপিপি, রোভার স্কাউটসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী ও সহায়ক প্রতিষ্ঠান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় কাজ করছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের কাজের ধরন প্রায় একই ধরনের হলেও আলাদা কাঠামোর কারণে মাঠপর্যায়ে সমন্বয়ের ঘাটতি তৈরি হয়।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের এক যুগ্ম সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। সে কারণেই বিভিন্ন সংস্থাকে একত্রিত করে একটি সমন্বিত কর্তৃপক্ষ গঠনের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছিল এবং নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তা আবার আলোচনায় এসেছে।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এ ধরনের একটি কর্তৃপক্ষ গঠন করা হলে দুর্যোগের সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হবে এবং মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম বাস্তবায়নে গতি আসবে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক জটিলতা কমবে এবং সময় ও ব্যয়ের অপচয় অনেকাংশে হ্রাস পাবে।
সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, সামনে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাসকে বাংলাদেশের ঋতু পরিবর্তনের সময় হিসেবে ধরা হয়। এই সময়ে ঝড়, কালবৈশাখী, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যাসহ বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি থাকে। তাই দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে দুর্যোগের ধরন ও তীব্রতা ক্রমেই বাড়ছে। এমন বাস্তবতায় আধুনিক ও সমন্বিত কাঠামোর মাধ্যমে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা সময়ের দাবি।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ আবদুল মান্নান বলেন, বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, কালবৈশাখী ও জলোচ্ছ্বাসের মতো নানা দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকে। এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, বিভিন্ন সংস্থা যদি আলাদা কাঠামোয় কাজ করে তবে অনেক সময় কার্যক্রমে বিলম্ব ঘটে। একটি সমন্বিত কর্তৃপক্ষ থাকলে পরিকল্পনা গ্রহণ, তথ্য আদান প্রদান এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন অনেক সহজ হবে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বের অনেক দুর্যোগপ্রবণ দেশে কেন্দ্রীয় সমন্বয় কাঠামোর মাধ্যমে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয়। বাংলাদেশেও এ ধরনের শক্তিশালী সমন্বিত কাঠামো গড়ে উঠলে তা দুর্যোগ মোকাবিলায় দেশের সক্ষমতা আরও বাড়াবে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিপূর্ণ এই দেশে সমন্বিত প্রস্তুতি কেবল একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়, এটি মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার। সময়োপযোগী পরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগই দুর্যোগের মুখে মানুষের আস্থা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।