নির্বাচনের আগে গেজেটে নিজেকে এক বছরের জন্য ভিভিআইপি ঘোষণা করেন মুহাম্মদ ইউনূস
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক দুই দিন আগে জারি হওয়া একটি সরকারি গেজেটে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে দায়িত্ব হস্তান্তরের তারিখ থেকে এক বছরের জন্য ভেরি ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট পারসন বা ভিভিআইপি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর ফলে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত তিনি স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স এসএসএফের নিরাপত্তা সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হন।
গেজেট অনুযায়ী, বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী আইন ২০২১ এর ধারা ২ ক এর আওতায় এ মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। ওই আইনে বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান ছাড়াও সরকারি গেজেটের মাধ্যমে ঘোষিত অন্য কোনো ব্যক্তিকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার বিধান রয়েছে।
গেজেটটি জারি করেন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সচিব মো. সাইফুল্লাহ পান্না। বর্তমানে তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত রয়েছেন। এ বিষয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সরকারি বিধি অনুযায়ী, গেজেটের মাধ্যমে প্রকাশিত সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত হওয়ার পরই তা রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকর ও প্রামাণ্য নথি হিসেবে বিবেচিত হয়। সাধারণত এসব গেজেট বাংলাদেশ গভার্নমেন্ট প্রেসের ওয়েবসাইটেও সংরক্ষণ ও প্রকাশ করা হয়।
তবে সংশ্লিষ্ট আর্কাইভ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি জারি হওয়া ওই গেজেটটি বাংলাদেশ গভার্নমেন্ট প্রেসের অনলাইন তালিকায় প্রকাশিত হয়নি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ গভার্নমেন্ট প্রেসের উপপরিচালক মোহাম্মদ আবু ইউসুফ জানান, গেজেটটি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে পাঠানো নথির ভিত্তিতেই মুদ্রিত হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নির্দেশনার কারণে এটি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়নি।
তিনি বলেন, কোনো গেজেট ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ওপর নির্ভর করে। যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্দেশনা দেয় যে কোনো গেজেট অনলাইনে প্রকাশ করা যাবে না, তাহলে সেটি ওয়েবসাইটে দেওয়া হয় না।
গোপনীয়তার কারণে কিছু গেজেট অনলাইনে প্রকাশ না করার বিধানও রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন এবং বলেন, সংশ্লিষ্ট গেজেটটি যথাযথ প্রক্রিয়া মেনেই জারি হয়েছে।
এ বিষয়ে সাবেক প্রধান উপদেষ্টার প্রেস টিমের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা বর্তমানে দায়িত্বে না থাকার কথা উল্লেখ করে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী বা প্রধান উপদেষ্টা এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা বিধিমালা ২০২৫ অনুযায়ী, ভিভিআইপি হিসেবে ঘোষিত ব্যক্তির বাসভবন ও কর্মস্থলে এসএসএফের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে। তার উপস্থিতিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা তল্লাশি চালানো হয় এবং বিদেশ সফরের সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের মাধ্যমে নিরাপত্তা সমন্বয় করা হয়।
এছাড়া এসএসএফ ভিভিআইপির সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের পটভূমি যাচাই, বাসভবন বা কার্যালয়ে দর্শনার্থী প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং অনুষ্ঠানস্থলে নিরাপত্তা তদারকির দায়িত্ব পালন করে।
মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গঠিত ওই সরকারে তিনি প্রায় ১৮ মাস দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা ত্যাগ করেন।
পর্যবেক্ষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনিক কাঠামোর একটি স্বীকৃত অংশ। একই সঙ্গে এ ধরনের সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া বজায় থাকাও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।