রাজনৈতিক চাপের কাছে নতিস্বীকার নয়, এমডিদের সরাসরি জানাতে বললেন গভর্নর
রাজনৈতিক চাপের কাছে নতিস্বীকার করবেন না বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ঋণ অনুমোদন বা সুশাসনসংক্রান্ত বিষয়ে কোনো ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মুখে পড়লে তা সরাসরি তাকে জানাতে হবে।
রোববার ১ মার্চ ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ এবিবির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে গভর্নর এ অবস্থান ব্যক্ত করেন। সভায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর, নির্বাহী পরিচালক এবং এবিবির চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিনের নেতৃত্বে ১৯টি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক উপস্থিত ছিলেন।
সভা শেষে এবিবি চেয়ারম্যান জানান, গভর্নর আন্তরিক ও সৌজন্যমূলক পরিবেশে বৈঠক পরিচালনা করেন এবং অংশগ্রহণকারী ১৯ জন এমডির বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনেন। তিনি ব্যাংকিং খাতে তার কয়েকটি অগ্রাধিকার তুলে ধরেন।
মাসরুর আরেফিন বলেন, গভর্নর ব্যবসা ও উৎপাদনবান্ধব পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন, যার লক্ষ্য এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি। খেলাপি ঋণের কারণে সৃষ্ট অকার্যকর সম্পদ উৎপাদনমুখী খাতে ব্যবহারের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করে নতুন উৎপাদন বা সেবাখাতে যুক্ত করার সম্ভাবনাও আলোচনায় আসে।
সভায় ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন গভর্নর। উদাহরণ হিসেবে অষ্টগ্রামের পনিরকে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দিতে ব্যাংকগুলোর সহায়তার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। জেলা ও গ্রামভিত্তিক পণ্যকে অর্থায়ন ও বাজারসুবিধা দিয়ে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এবিবির পক্ষ থেকে এসএমই খাতে অর্থায়ন এবং পুনঃঅর্থায়ন প্যাকেজ অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি গভর্নরের কাছে তুলে ধরা হয়।
সভায় গভর্নর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি দেন বলে জানান এবিবি চেয়ারম্যান। এর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক চাপ প্রতিরোধ, ঋণ ও সুশাসন বিষয়ে হস্তক্ষেপ হলে সরাসরি অবহিত করার আহ্বান, ব্যাংকিং খাতে সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখা এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমাতে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া। সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের বোর্ড পুনর্গঠন প্রক্রিয়াও চলমান থাকবে।
এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধাপে ধাপে কিছু নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার পরিকল্পনা করছে। প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত নীতিমালার আওতায় ব্যাংকগুলোকে স্বাধীনভাবে ভাড়া ও লিজিং চুক্তি করার সুযোগ দেওয়া হবে। রপ্তানি প্রণোদনা, ইডিএফ ফেরত এবং রেমিট্যান্স প্রণোদনার বকেয়া অর্থ ছাড় সহজ করার উদ্যোগও নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, চলমান সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যাংকগুলোকে সহযোগিতা করতে বলা হয়েছে। নতুন শাখা খোলার ক্ষেত্রে অফিস স্পেসের ভাড়া কাঠামো নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে প্রতিবার অনুমোদনের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতির প্রয়োজন না পড়ে।
ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতা, সুশাসন ও উৎপাদনমুখী অর্থায়নের ওপর জোর দিয়ে গভর্নরের এই অবস্থান খাতটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আর্থিক খাতে আস্থা ও শৃঙ্খলা বজায় থাকলেই টেকসই প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।