গ্রেপ্তার আতঙ্কে হাসপাতালে না গিয়ে গোপনে চিকিৎসা নিচ্ছেন ইরানের বিক্ষোভকারীরা
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় আহত অনেক বিক্ষোভকারী গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় হাসপাতালে না গিয়ে গোপনে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। আহতদের অনেকে নিরাপত্তাজনিত কারণে নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে বাসাবাড়িতে কিংবা পরিচিত চিকিৎসকদের মাধ্যমে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
ইরানের মধ্যাঞ্চলীয় শহর ইসফাহানে বিক্ষোভে অংশ নিতে যাওয়ার সময় ছদ্মনামে পরিচিত তারা নামের এক বিক্ষোভকারী জানান, নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে তিনি এবং তার এক বন্ধু আহত হন। পরে স্থানীয় কয়েকজনের সহায়তায় তারা একটি গাড়িতে ওঠেন, তবে গ্রেপ্তার হওয়ার ঝুঁকির কথা ভেবে হাসপাতালে যেতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি থাকায় তারা আশ্রয়ের জন্য একটি বাড়িতে গিয়ে রাত কাটান এবং পরে পরিচিত একজন চিকিৎসকের মাধ্যমে ক্ষত পরিষ্কার করান।
এদিকে আন্দোলনে হতাহতদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা এখনও স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্ট নিউজ এজেন্সি এইচআরএএনএ দাবি করেছে, চলমান আন্দোলনে তারা ৬ হাজার ৩০১ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে। সংস্থাটি আরও ১৭ হাজার ৯১ জনের মৃত্যুর প্রতিবেদন যাচাই করছে এবং অন্তত ১১ হাজার বিক্ষোভকারী গুরুতর আহত হয়েছেন বলে ধারণা করছে।
অন্যদিকে ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই পরিস্থিতিতে ৩ হাজার ১০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। তবে তাদের দাবি, নিহতদের বেশির ভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য অথবা পথচারী, যারা দাঙ্গাবাজদের হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন।
স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতালগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি থাকায় আহতরা সেখানে যেতে ভয় পাচ্ছেন। তেহরানের এক সার্জন নিমা জানান, তিনি কাজের পথে আহত তরুণদের পড়ে থাকতে দেখে একজনকে গাড়িতে করে হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে পথে পুলিশি তল্লাশির আশঙ্কায় তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন বলেও জানান।
আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে জানিয়েছে, বিক্ষোভ চলাকালে ১৩ হাজার অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, জনগণের আস্থার কারণে গত কয়েক দিনে বাড়িতে চিকিৎসা নেওয়া প্রায় ৩ হাজার মানুষ পরে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হয়েছেন।
চোখে আঘাতের ঘটনায়ও উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে। তেহরানের ফারাবি চক্ষু হাসপাতালের প্রধান ডা. কাসেম ফাখরাই জানিয়েছেন, ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত গুরুতর চোখের আঘাত পাওয়া ৭০০ রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে এবং প্রায় ২০০ জনকে অন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
কিছু আহত ব্যক্তি জানিয়েছেন, হাসপাতালের নার্সরা নিরাপত্তাজনিত কারণে আহত বিক্ষোভকারীদের পেছনের দিক দিয়ে স্টাফ লিফট ব্যবহার করে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাচ্ছিলেন। চিকিৎসকদের একটি অংশ মেডিকেল রেকর্ডে গুলিবিদ্ধ হওয়ার তথ্য উল্লেখ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে, যাতে নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারিতে ঝুঁকি না বাড়ে।
এদিকে ছোট শহরগুলোতে পরিস্থিতি আরও জটিল বলে মনে করছেন মানবাধিকারকর্মীরা। তারা বলছেন, আহতদের চিকিৎসা দেওয়া চিকিৎসক ও স্বেচ্ছাসেবকরাও এখন নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারি ও গ্রেপ্তারের ঝুঁকিতে পড়ছেন। ইরান হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, গত সপ্তাহে অন্তত পাঁচজন চিকিৎসক এবং একজন স্বেচ্ছাসেবককে গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া গেছে।